ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ফেব্রুয়ারী ২, ২০১৫

ঢাকা রবিবার, ৬ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ২২ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১

মতামত ফেডারেল পদ্ধতির সরকার ও উচ্চকক্ষ গঠনই রাজনীতির সমাধান

ফেডারেল পদ্ধতির সরকার ও উচ্চকক্ষ গঠনই রাজনীতির সমাধান

খোন্দকার আতাউল হক

খোন্দকার আতাউল হক

খোন্দকার আতাউল হক, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, নিরাপদনিউজ : বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বহুল পরিচিত শাসনব্যবস্থা। গণতন্ত্র হলো কোনো জাতিরাষ্ট্রের এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের বা শ্রম-কর্ম-পেশার মানুষের নীতিনির্ধারণে অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাব, প্রণয়ন ও তৈরির ক্ষেত্রে সব নাগরিকের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে বলা হয়েছে।
আমাদের শাসকদের দেশ পরিচালনায় ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মহুতির কোনো প্রতিফল দেখা যায় না। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু, জিয়া, এরশাদ, বেগম খালেদা ও শেখ হাসিনা সকলেই এক কাতারে অবস্থান করছেন। সশস্ত্র যুদ্ধ একটি জনগোষ্ঠির যে হাজার বছরের পরাধীনতার অবসান ঘটিয়ে মানুষের জীবন প্রণালীতে যে প্রতিফলন হওয়ার কথা তা বেমালুম ভুলে গেছেন। এসব কারণেই আজকে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েও স্বাধীন গণতান্ত্রিক পরিবেশ অবর্তমান। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে স্বাধীনতনার পর থেকে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে তারা ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের আদলে দেশ পারিচালনা করছে। তারা গণতন্ত্রকে নিজ অথবা দলীয় পকেটে ভরে দেশে একটি সহিংস ও অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতির উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে দেশে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। নচেৎ এমন সহিংস অপরানীতির অবসান হবে না।
বর্তমান নৈতিকতাবর্জিত ও সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে রাষ্ট্র ও জাতিকে রক্ষা করতে হলে সাংবিধানিকভাবে ‘ফেডারেল’ পদ্ধতির কেন্দ্রীয় সরকার ও ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন করতে হবে। বর্তমান ১০ম সংসদের ৫ম অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ অধিবেশন চলবে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। সুতরাং রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, সুশাসন এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের জন্য সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজনে। সেই সংশোধনী হবে ‘ফেডারেল’ পদ্ধতির কেন্দ্রীয় সরকার ও ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন। সংবিধানের এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বিকেন্দ্রিকরণ করতে হবে। কারণ ক্ষমতা কেন্দ্রিকরণ করা হলে সমগ্র দেশে এমন সর্বনাসা ও সহিংস রাজনীতির আর সুযোগ থাকবে না। জনমনেও স্বস্তি ফিরে আসবে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে যে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে তার চির অবসান হবে। এককেন্দ্রিক ক্ষমতা ও এককেন্দ্রিক সংসদ থাকার করণে রাজনৈতিক দলগুলো গোটা জাতিকে জিম্মি করেছে।
ক. ‘ফেডারেল’ পদ্ধতির কেন্দ্রীয় সরকার, খ. ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন, গ. নির্দলীয় বা অদলীয় একজন সভাপতি বা চেয়ারম্যান (প্রধান উপদেষ্টা) ও ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান, ঘ. প্রদেশ গঠন ও নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা এবং স্ব-শাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। সংসদে ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে আর কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বিমত থাকা যৌক্তিক হবে না বলে রাজনীতিক বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।
‘নিম্নকক্ষ’ হবে ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট। এই ৩০০ সদস্য রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত এলাকা ভিত্তিক জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকবেন। ‘উচ্চকক্ষ’ হবে ২০০ সদস্যবিশিষ্ট। ‘উচ্চকক্ষে’ থাকবেন, ক. শ্রম-কর্ম-পেশায় নিয়োজিত (শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী) ব্যক্তিদের দ্বারা নির্দলীয় বা অদলীয়ভাবে নির্বাচিত সদস্য, খ. নির্দলীয় বা অদলীয়ভাবে নির্বাচিত নারী সদস্য, গ. ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নাগরিকদের দ্বারা নির্দলীয় বা অদলীয়ভাবে নির্বাচিত সদস্য, ঘ. রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত সদস্য (মূলত প্রতিরক্ষাবাহিনী এবং আমলা-কর্মকর্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্য থেকে), ঙ. জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী আনুপাতিক হারে রাজনৈতিক দলসমূহের মনোনীত সদস্য এবং প্রবাসী বাংলাদেশের নাগরিকদের ১০ জন নির্বাচিত সদস্য থাকবেন।
আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজপতিরা বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে আসল বিষয় বাদ দিয়ে নকল নিয়ে টানাটানি করছেন। তারা কেবল দু’টি বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় দিয়ে বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন। তারা বলছেন, দুই নেত্রী বা দুই দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সংলাপ হলেই সব সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু কোনোকালে কোথাও কি সংলাপ সফল হয়েছে? ইতিহাসের পাতা উল্টালে উত্তর মিলবে ‘না’। বুদ্ধিজীবীরা সেই ‘না’-কে হ্যাঁ বলার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। অথচ ‘উচ্চকক্ষ’ দ্বারাই জাতীয় সংসদের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। বুদ্ধিজীবীদের এই মেধাহীনতা কেন? কেনই বা বুদ্ধিজীবীরা মেধা ও বুদ্ধির ক্ষেত্রে দরিদ্রতা প্রকাশ করেন।
বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে দেশে ‘উচ্চকক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করা। পৃথিবীর প্রায় সকল উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে ‘নিম্নকক্ষ’ ও ‘উচ্চকক্ষ’-এর সমন্বয়ে ‘দুইকক্ষ’ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট রয়েছে। ‘নিম্নকক্ষ’ দেশে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করবে আর ‘উচ্চকক্ষ’ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জাতীয় অর্থনীতি, জাতীয় নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সঙ্কট (যদি হয়) সমাধান করার ব্যবস্থা থাকে।
এ কথা এখন মানতেই হবে যে, অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্র এবং জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করা সম্ভব না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী একটি কল্যাণকর আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে চলতি সংসদে অধিবেশনে ‘ফেডারেল’ পদ্ধতির কেন্দ্রীয় সরকার ও ‘উচ্চকক্ষ’ বিল উত্থাপন এবং পাস করতে হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে বড় দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে টানপোড়েন চলছে, তার সাংবিধানিক সমাধান ‘উচ্চকক্ষ’ই করতে পারে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে সম্পূর্ণ অদলীয় এবং সাংবিধানিক। এ জন্য সংলাপের প্রয়োজন হয় না। সংগ্রাম সংঘাত করার দরকার হয় না। বুদ্ধিজীবীরা এখানে নীবর। তারা কেবল টক শোতে বসে টকটক করে সংলাপের নামে একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছেন। এটা বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়।
পৃথিবীর বহু বৃহৎ এবং ছোট ছোট রাষ্ট্রতেও ‘ফেডারেল’ পদ্ধতির কেন্দ্রীয় সরকার, ‘দুইকক্ষ’ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও প্রদেশ রয়েছে। সেসব দেশে তো জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংঘাত, হানাহানি রক্তপাত হয় না। বুদ্ধিজীবীরা সে সব কথা না বলে দলীয় আদলে জাতিকে উপদেশ দেন। আসলে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মুক্তবুদ্ধির চর্চা না করে দলবাজি করেন। সমস্যা সমাধানের কথা না বলে দলের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন।
রাজনীতিকরা স্বাধীনতার পর থেকে আজও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কের উর্ধ্বে রাখতে পারেনি। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আদলের শাসনব্যবস্থা বহাল রেখেই রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিদেশি শাসক বদলিয়ে দেশীয় শাসকরা ঔপনিবেশিক শাসকদের অনুকরণে ক্ষমতার রাজনীতি করছে।-সংগৃহীত
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক, কলামিস্ট।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)