ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৮

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৪ রবিউস-সানি, ১৪৪১

ফিচার বিলুপ্তির পথে তালগাছ: হারিয়ে গেছে বাবুই পাখি

বিলুপ্তির পথে তালগাছ: হারিয়ে গেছে বাবুই পাখি

কলারোয়া,নিরাপদ নিউজ: একসময় দৃষ্টি যেখানে পড়েছে সেখানেই দেখা গেছে তাল গাছ। যে তালগাছকে অবলম্বন ভেবে হাজার হাজার বাবুই পাখি ও অন্যান্য বসন্তের পাখি দেখা যেতো অহোরহো। বাসা বাঁধতো তালগাছে বাবুই পাখি । এমনকি মানুষের বসত বাড়ির ছাঁদের কোন গর্ত বা চালের ছাউনির নিচে ছিল চডুই পাখির  বাস। কিন্তূ  বর্তমান মাইলকি মাইল ঘুরে দেখার চেষ্টা করলেও দেখা পাওয়া বড় দুরূহ ব্যপার তালগাছ ও বাবুই পাখি। তালগাছ এবং বাবুই পাখি দুটোই একেবারে বিলুপ্ত। চডুই পাখি কিছু কিছু দেখা যায়। কালের বিবর্তনে এখন আশে পাশের কয়েকটি জেলাসহ সাতক্ষীরা পার্শ্ববর্তী যশোরের সকল উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ ও চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরীর কারিগর সেই বাবুই পাখি ও তাদের দৃষ্টিনন্দন বাসা।কবির ভাষায়, ‘বাবুই পাখিরে ডেকে , বলেছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই, আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী ছড়াটির নায়ক আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরীর কারিগর সেই বাবুই পাখি এখন বিলুপ্তির পথে।বিলুপ্তির পথে তালগাছ ।

উল্লেখ জেলারগুলোর কোথাও দু একটা তালগাছ অবহেলিত অবস্থায় থাকলেও আর আগের মত বাবুই পাখি ও পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা চোঁখে পড়ে না।

হয়তো কোন এক অজানা কারণে কিংবা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এখন হারিয়ে গেছে তালগাছ ও বাবুই পাখি। এক সময় সাতক্ষীরাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা উপজেলার নদীর পাড় কিংবা সড়ক-মহসড়কের দুই পাশে এমনকি আনাচে-কানাচে ও গ্রামগঞ্জের মাঠে বাগানে ছিল সারি সারি তালগাছ।

সেসব তালগাছের উপরে তাকালে এর পাতায় পাতায় দেখা যেত বাবুই পাখির বাসা।এবং এলাকায় দেখা যেতো চড়ুই পাখিরও বিচরণ ।দেখা যেত মা চাচিদের ধান স্বিদ্ধ শোকানো উঠানে ধানের উপর উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য চডুই পাখির । তালগাছে বাবুইরা এসব বাসা তৈরী করত তালের পাতা, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতাপাতা দিয়ে। কি যে চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরী করত বাবুই পাখিরা তা আগামী প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যাবে। হবে ইত্যাদি ।বাবুই পাখির বাসা দেখতে যেমন ছিল দৃষ্টিনন্দন,তেমনি ছিল খুব মজবুত।প্রবল ঝড়-বাতাসের মাঝেও টিকে থাকে তাদের বাসা।বাবুই পাখির শক্তবুননের এ বাসা টেনে ছেড়াও ছিল খুব কঠিন।বাবুই পাখি নিয়ে ভাবতে গেলেই মনে হয় এরা যেন শিল্পী, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি।যেটা ছিল সম্পূর্ণ সৃষ্টিকর্তা কতৃক বিশেষ তৈরির কারিগর বাবুই পাখি।

বাবুই পাখিদেরও মাঝেও দেখা যেত নিবিড় প্রেম-ভালবাসা।যেটা মানুষের মাঝে বর্তমান পাওয়া আলেয়ার পেছনে ছুটার মত হয়ে গেছে। এদের আরেক ধর্ম, এরা এক বাসা থেকে আরেক মাঠ বা বাসায় যায় তাদের পছন্দের সঙ্গীনি খুঁজতে।পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য কত কিছুই না যে করে পূরুষ বাবুইরা তা না দেখে বুঝার উপায় নেই।যেটা কবুতরের ভিতরেও পাওয়া যায় কম বেশি। পুরুষ বাবুই নিজের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য খাল-বিল কিংবা নদীনালা ও ডোবায় গোসল সেরে ফুর্তিতে নেচে নেচে বেড়ায় তাল গাছের পাতায় পাতায়।তাঁরা সঙ্গী পেলে পরে উচু তাল গাছ, নারিকেল গাছ কিংবা সুপারি গাছের পাতায় বাসা তৈরীর কাজ শুরু করে।

বাসা তৈরীর অর্ধেক কাজ শেষ হলেই তাদের ভাষায় স্ত্রী বাবুইকে ডেকে দেখায়। স্ত্রী বাবুইর বাসা পছন্দ হলে পুরো কাজ শেষ করে আর পছন্দ না হলে অর্ধেক কাজ করেই নতুন করে আরেকটি বাসা তৈরীর কাজ শুরু করে।একটি বাবুই পাখি অর্ধেক বাসা তৈরী করতে সময় লাগে আনুমানিক এক সপ্তাহ বলে জানান মুরুব্বিরা ।স্ত্রী বাবুইর বাসা পছন্দ হলে বাকিটা শেষ করতে সময় লাগে আরো ৪/৫ দিনের মত ।কেননা তখন পুরুষ বাবুই মহা আনন্দের সাথে বিরামহীনভাবে কাজ করে।স্ত্রী বাবুইর প্রেরণা পেয়ে পুরুষ বাবুই পাখিটি খুবই শিল্পসম্মত নিপুণভাবে বাসা তৈরীর কাজ শেষ করে তাদের সংসার শুরু করে।এমন ভালবাসা মানুষের দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিকটাও চোখে পড়ে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, স্ত্রী বাবুই ডিম দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষ বাবুই খুঁজতে থাকে আরেক সঙ্গীনিকে।যেটা বর্তমান মনুষত্ব্য সমাজে পরকিয়াকে ধরা যেতে পারে। পুরুষ বাবুই এক মৌসুমে ৫-৬টি পর্যন্ত বাসা তৈরী করতে পারে।

অর্থাৎ এরা ঘর সংসার করতে পারে বাসানুপাতে সঙ্গীনির সাথে। এতে স্ত্রী বাবুইদের পক্ষ থেকে কোন বাধা থাকেনা। মানুষের ক্ষেত্রে বাধা দেখা যায় মোটামুটি ।প্রাকৃতিক ভাবে প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমে তাপ দেয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাচ্চা ফুটে থাকে ।তিন সপ্তাহ পর বাবুই পাখির বাচ্চারা বাসা ছেড়ে উড়ে যেতে পারে।বাবুই পাখির প্রজনন সময় হলো যে কোনো নতুন ধান ঘরে উঠার মৌসুম।কেননা তখন স্ত্রী বাবুই দুধধান সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়।বাবুই পাখিরা তাল গাছের পাতায় বাসা বাধে বেশি।আগের দিনে যখন সাতক্ষীরা ও পার্শ্ববর্তী জেলা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে মাথা উচু করে দাড়িঁয়ে থাকতে দেখা যেত তালগাছ, তখন বাবুই পাখিরাও ছিল।সাতক্ষীরা তথা কলারোয়া উপজেলা থেকে এখন হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ। এরই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি ও তাদের কিচিমিচি কোলাহল। তালগাছ ও বাবুই পাখি হারিয়ে যাওয়ার পিছনে জড়িত রয়েছে একশ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ। যারা নির্বিচারে কেটে ফেলছে তালগাছ। তালগাছ কেটে ফেলায় এলাকার হাটবাজারে আগের মত তালও আর পাওয়া যায় না।যার দৃশ্য দেখা যেত ভোর সকালে তালগাছ তলায় গেলে।

তালগাছ নিয়ে কথা বলছিলাম স্থানীয় কিছু মুরুব্বিদের সাথে।এসময় তাঁরা দুঃখ-প্রকাশ করে বললেন, কে বলেছে নির্বিচারে তালগাছ কেটে ফেলার কারণে এলাকার হাটবাজার গুলোতে আগের মত তাল পাওয়া যায় না।হাটবাজারে আগের মত তাল না পাওয়ার ফলে মৌসুমি তালপিঠাসহ আরো কতো কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা জানান ।এসব আলাপচারিতার মাঝেই ক’জন মুরুব্বি এগিয়ে এসে বলেন, এ বছর দেখছি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন রাস্তার পাশে তালের ছারা লাগানো হয়েছে।কিন্তু দুর্ভাগ্য এগুলোও অযন্ত আর অবহেলার কারণে বেড়ে উঠছে না।যেটা অতিতে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠেছে বিভিন্ন বন বাদড়ে। তেমন ক্ষতিও করত না তখন তালগাছ গুলো। যেটা বর্তমান বিভিন্ন জ্বালানির জন্য চলে গেছে ইট ভাটাসহ বিভিন্ন জ্বালানি খাতে।সামান্য অর্থের লোভে বন বাদড় উজাড় হয়েছে।তবে প্রশাসনের উদ্যোগে যেসকল তালের চারা রোপন করা হয়েছে সেগুলো যদি সঠিক নজরদারি এবং পরিচর্যা না করা হয় তাহলে বেড়ে উঠতে কষ্টকর হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।এবং তালগাছে অনেকটাই বজ্রপাত ঠেকাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে বলে মনে করেন বয়োজোষ্ঠরা ।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)