ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট নভেম্বর ১৯, ২০১৯

ঢাকা রবিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৭ রবিউস-সানি, ১৪৪১

ফিচার বিস্ময় কিশোরী: ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ঘুম বা ক্লান্তি কোনও বোধই তার নেই!

বিস্ময় কিশোরী: ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ঘুম বা ক্লান্তি কোনও বোধই তার নেই!

নিরাপদ নিউজ : ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ঘুম বা ক্লান্তি। কোনও বোধই তার নেই। ১০ বছরের অলিভিয়া ফ্রান্সওয়ার্থ বিস্ময়বালিকা। জন্মের পর থেকেই একের পর এক চমক নিয়ে যেন অপেক্ষা করে আছে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের হাডার্সফিল্ডের এই খুদে বাসিন্দা।

রহস্য যে কিছু আছে, অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন অলিভিয়ার মা নিকি ট্রেপাক। যখন তিনি দেখেছিলেন তার ৯ মাস বয়সি মেয়ে আদৌ ঘুমায় না।

৩৫ বছর বয়সি সিঙ্গেল মাদার নিকির আরও চার সন্তান আছে। তাদের সবার বয়স এখন ৭ থেকে ১৫ বছর। কিন্তু সবার থেকে আলাদা তার চতুর্থ সন্তান অলিভিয়া।

মায়ের মনে হতো, অলিভিয়া যেন ইস্পাত দিয়ে তৈরি। তার ক্ষুধা পায় না। ঘুমের জন্য বায়না নেই। এমনকি, ব্যথা পেয়েও কাঁদে না। চলছিল এভাবেই। কারণ, আর যাই হোক, মেয়ের কোনও শারীরিক অসুস্থতা ছিল না।

একদিন নিকির কাছে ফোন এল স্কুল থেকে। অলিভিয়া তখন নার্সারির ছাত্রী। স্কুল থেকে জানাল, সে পড়ে গিয়েছে। তার দাঁত ঠোঁটের মধ্যে ঢুকে গেঁথে রয়েছে।

আহত, রক্তাক্ত অলিভিয়াকে ডাক্তার বোঝাতে বসলেন, কাকে বলে প্লাস্টিক সার্জারি। কারণ সে যাত্রা ওই অস্ত্রোপচার ছাড়া তার গতি ছিল না। কিন্তু ডাক্তারের সামনেই অলিভিয়া তার ঠোঁটের ছিন্ন অংশ ধরে টানতে লাগল! ডাক্তার অলিভিয়ার মাকে বললেন, তার শিশুর মধ্যে অবশ্যই কোনও অস্বাভাবিকতা আছে।

কিন্তু এরপরেও যে চমক অপেক্ষো করে ছিল, তার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না নিকি। একদিন তার চোখের সামনে পথদুর্ঘটনার শিকার হল ছোট্ট অলিভিয়া। প্রথমে গাড়ির ধাক্কা, তারপর ওই গাড়ি-ই তাকে টেনে নিয়ে গেল বেশ খানিকটা দূরত্ব।

আতঙ্কে দিশেহারা নিকি এবং তার বাকি সন্তানরা তখন চিৎকার করে কাঁদছে। কিন্তু তাদের হতভম্ব করে কিছুক্ষণ পরে নির্বিকারভাবে ফিরে এল অলিভিয়া! দেহে আঘাতের চিহ্ন আছে। কিন্তু চোখমুখে কষ্ট বা ব্যথার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই।

দুর্ঘটনায় অলিভিয়ার মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। পায়ের পাতা এবং পশ্চাদ্দেশে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সে কিছু টেরই পায়নি! ডাক্তারও হতভম্ব! জানালেন, অলিভিয়া যদি ভয় বা ব্যথা পেত, তা হলে আঘাতের মাত্রা আরও অনেকগুণ বেশি হত।

পরবর্তী চিকিৎসায় জানা যায়, অলিভিয়া বিরল জিনগঠিত রোগের শিকার। ক্রোমোজোমের সেই অবস্থার জন্য তার ব্যথার অনুভূতি, ক্ষুধা-তৃষ্ণা বা ঘুমের অনুভূতি কিছুই নেই। ডাক্তারি পরিভাষায় এ রোগের নাম ‘ক্রোমোজোম সিক্স ডিলেশন’। আর এই বিরল রোগের শিকার বলে অলিভিয়া হল ‘বায়োনিক চাইল্ড’।

বিশ্বে প্রতি দুইশ’ জন শিশুর মধ্যে একজন এই বিরল রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু তার মধ্যেও রকমফের আছে। কারও কারও মধ্যে বিরলতার মাত্রা অতিরিক্ত হয়। অলিভিয়া সে রকমই একজন। সে কার্যত একজন অতিমানবীয় শিশুতে পরিণত হয়েছে।

নিকি জানিয়েছেন, অলিভিয়া টানা তিন দিন অবধি না ঘুমিয়ে থাকতে পারে। স্কুলে যাওয়ার পরে অলিভিয়াকে প্রথম হাই তুলতে দেখেছেন নিকি। ক্ষুধা-তৃষ্ণা বোধও তার বিশেষ নেই। মা নিকি-ই নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাকে খাবার দেন। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে অলিভিয়ার বায়নাও নেই। মিল্ক শেক, চিকেন নুডলস খেতে একটু আধটু ভালবাসে।

অলিভিয়ার ঘটনাকে বিরলের মধ্যে বিরলতম বলতে চান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স-এর বিভাগীয় প্রধান মৈনাক সেনগুপ্ত। তার কথায়, একসঙ্গে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ঘুম-ব্যথা, সব অনুভূতি লোপ পেয়েছে, এমন ঘটনা বিশ্বে আর কারও মধ্যে দেখা যায়নি। অলিভিয়ার অদ্ভুত শারীরিক অবস্থার কারণ অনুসন্ধান এখনও ধোয়াঁশায় ঢাকা বলে জানিয়েছেন তিনি। মানবদেহের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের প্রত্যেকটির দু’টি অংশ। ‘পি’ আর্ম ও ‘কিউ’ আর্ম। এর মধ্যে একটিতে কোনও বিচ্যুতি হলেই দেখা দেখা দেয় জিনগত জটিলতা।

এখনও অবধি বিশ্বে ১৫ হাজারের বেশি জিনগত জটিলতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। তার মধ্যে মাত্র একশ’ জন ‘সিক্স পি ডিলেশন’-এর শিকার। অর্থাৎ, ক্রোমোজোমের ৬ নম্বর জোড়ার পি বাহু অসম্পূর্ণ। কিন্তু তাদের মধ্যে একমাত্র অলিভিয়া ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ঘুম-ব্যথার অনুভূতিহীন। তাছাড়া, আমাদের দেহে ব্যথার অনুভূতি বোধ করা নির্ধারণ করে মূলত ক্রোমোজম ২। সেক্ষেত্রে কিন্তু অলিভিয়ার সমস্যা নেই। তারপরও তার দেহে যন্ত্রণার বোধ নেই।

অসঙ্গতি আছে অন্যত্রও। মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্রোমোজোম ৬-এর এমএইচসি যৌগ। অলিভিয়ার দেহে এই ক্রোমোজোমের গঠন ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু সে অস্বাভাবিক হলেও অসুস্থ নয়। অর্থাৎ তার দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েনি। ফলে জিন-রহস্যের অনেকটাই যে এখনও রহস্যাবৃত, সেটাই প্রমাণ করছে অলিভিয়া। সেরকমই ধারণা মৈনাক সেনগুপ্তর।

অলিভিয়াকে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরাতে চেষ্টার কোনও কমতি রাখেননি তার মা। ইতোমধ্যে চিকিৎসায় কিছুটা সাড়াও দিয়েছে সে। ধীরে ধীরে তার মধ্যে ফিরছে শ্রান্তির অনুভূতি। বাড়ছে ঘুমনোর সময়।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)