ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ডিসেম্বর ৫, ২০১৪

ঢাকা সোমবার, ১৪ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ১ জমাদিউস-সানি, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয়, এক্সক্লুসিভ, মিডিয়া মাহফুজ আনামের কলাম : আমাদের শিষ্টাচারের একি দশা!

মাহফুজ আনামের কলাম : আমাদের শিষ্টাচারের একি দশা!

মাহফুজ আনাম -ফাইল ফটো

মাহফুজ আনাম -ফাইল ফটো

ঢাকা, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪, নিরাপদনিউজ ডেস্ক : রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ উভয়টিই যখন অভদ্র হয়ে ওঠে তখন দেশে যে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে না এটা স্পষ্ট হয়ে যায়। আমাদের ভেতর ন্যূনতম শিষ্টাচারবোধ কতটুকু আছে সেটাও গণতন্ত্রের একটা পূর্বশর্ত। গত দুই দশকের আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বন্দ্ব-সংঘাতমূলক রাজনৈতিক পরিবেশে আমরা শিষ্টাচারের অনুভূতিটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। এটা খুবই দুঃখজনক। আর এ অবস্থার সবচাইতে খারাপ নজির দেখা গেছে গত সংসদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় মহিলা সদস্যদের আচরণে। এসব যাই হোক, একই ধরনের অভদ্র ভাষার প্রয়োগ যখন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে করা শুরু হয়েছে, তখন আমাদের জানতে ইচ্ছা করে- এটা কি অজ্ঞতা, অপ্রাপ্ত বয়স্কতা, ক্ষমতার মতিবিভ্রম নাকি প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য?
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দীর্ঘ দিনের। কূটনীতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে দেশটি অনবহিত নয়। এজন্য আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা সম্পর্কে তার বক্তব্যে যে অভদ্র ভাষা ব্যবহার করেছেন তা তার অপ্রাপ্ত বয়স্কতা, ক্ষমতার মতি বিভ্রম এবং ঔদ্ধত্যের চরম বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের অবস্থানে আপনি অবিচল, অনমনীয় এমনকি বিনয়ের সঙ্গে প্রতিপক্ষকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কিন্তু তাই বলে কাউকে আপনি অপমান করতে পারেন না। এমনকি তা প্রকাশ্যেও করা উচিত নয়। এমনকি কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর ইচ্ছা মনে মনে পোষণ করলেও এটা উচিত নয়।
আমাদের বিশ্বাস, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চায় বাংলাদেশ। যদি তাই হয় তাহলে সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যের পর আমরা কী পদক্ষেপ নিলাম? নিশা দেশাই বিসওয়ালকে ‘দুই পয়সার মন্ত্রী’ বলে মন্তব্য করেছেন আমাদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। আশরাফ তার গোষ্ঠীগত পরিচয়, বয়স, লিঙ্গ এবং তিনি যে অবিবাহিত এটা নিয়েও মন্তব্য করেছেন।
দীর্ঘ দিন লন্ডনে বসবাস করে আসা এবং প্রায় সবদিক দিয়েই আধুনিক এই মন্ত্রী কি জানেন না, একজন সফল মহিলা, পেশাদার কূটনীতিকের বিষয়ে এ ধরনের মন্তব্য প্রতিক্রিয়াশীলতা হিসেবে বিবেচিত হবে। আর তার বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে মন্তব্য করাতো লিঙ্গ বৈষম্যের পর্যায়ে পড়ে।
সৈয়দ আশরাফ কি এটাও জানেন না যে, সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার জন্য গোষ্ঠীগত পরিচয়, লিঙ্গ, বয়স এবং ২ পয়সা কিংবা ২০ পয়সার মন্ত্রিত্ব এগুলো নিশা দেশাইয়ের কাছে কিছুই না। এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন আমেরিকান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে।
নিশা দেশাই যা করছেন, যা বলছেন এবং যাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তার সবগুলো আমেরিকান সরকারের হয়ে করছেন। ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনাকে নিয়ে আশরাফের বক্তব্য আরো আক্রমণাত্মক। তার সমালোচনা করে গত শনিবার খুলনার এক সমাবেশে আশরাফ বলেন, “আমার বাসায় একটা কাজের মহিলা আছে যার নাম মর্জিনা। ড্যান মজীনা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামাতে চাচ্ছে- কাজের মহিলাকে এ কথা জানাবার পর সে তার নাম বদলে ফেলার আগ্রহ প্রকাশ করে।”
ড্যান মজীনাকে নিয়ে আশরাফের কাজের বাসার মহিলার উদাহরণ নিঃসন্দেহে তার মন মানসিকতা ও অভিপ্রায় নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। আর এ ধরনের আচরণ আমাদের সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে হীন করছে। আমরা জানতে চাচ্ছি তিনি কেন এসব করছেন, তার উদ্দেশ্যই কি তাদের অপমান করা।
এধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য সঠিক কোনো পথ নয়। এটা অবিশ্বাস্য যে, দুটি সার্বভৌম দেশের আলাদা কোনো পছন্দ, নীতিগত সিদ্ধান্তে মতপার্থক্য এবং পরিস্থিতির আলাদা মূল্যায়ন থাকবে না। পৃথিবী যেখানে বিশ্বায়নে পথে এগুচ্ছে সেখানে এটা অবিশ্বাস্য যে, এক দেশ আরেক দেশের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, কিংবা শাসনের অধীনে চলে যাবে। যতই আমরা বিভিন্ন দেশ কাছাকাছি আসবো ততই পার্থক্যগুলো প্রকাশিত হবে, আর এর মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সামনের কূটনীতিক ভবিষ্যত হবে সূক্ষ্ম দৃঢ়তা এবং বুদ্ধিমত্তার নমনীয়তার প্রতীক। এর কোথাও অভদ্রতা ও অপমানের কোনো জায়গা থাকবে না।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অভদ্র মন্তব্য করে যে ক্ষতি সৈয়দ আশরাফ করেছেন, তার ওপর এখনো তিনি অনড়। এটা থেকে সরে আসার কোনো ক্ষুদ্র চেষ্টাও তার মধ্যে নেই। অথচ একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বড় মনের মানুষ ও উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা এর জন্য প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েছেন এবং ব্যক্তিগতভাবেও এটা থামাতে চেষ্টা করেছেন। আমরা যতদূর জানি, এর কোনোটাকেই পাত্তা দেয়া হয়নি। সৈয়দ আশরাফ তার বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি কিংবা এর কোনো ব্যাখা দেননি এবং ক্ষমাও চাননি। মানুষ ক্ষণিকের ভুলে কিংবা বুদ্ধি-জ্ঞান হারালে কাউকে অপমান করে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাবার পরও যখন কোনো অপমানের ঘটনার ব্যাখা দেয়া হয় না, তখন ধরেই নিতে হয় যে এটা বুঝেশুনে হয়েছে, যেমনটা আমরা ধারণা করেছি তেমন নয়। অথবা এটা তৈরি করা হয়েছে।
আমরা এখনো এটার কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু এরপর অধিক নীরবতা অবলম্বন করা হলে সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। তারপর আমাদের প্রশ্ন আসতেই পারে, সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যে আমাদের এমন কী জাতীয় স্বার্থ জড়িত? এর কারণে যদি আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে থাকে, তাহলে তা ফিরিয়ে আনতে আমরা কী পদক্ষেপ নিলাম?
অপরদিকে পৃথিবীর অন্য দেশ ও কূটনীতি থেকে সরে এসে যদি নিজেদের নিয়ে কথা বলতে হয়, আমাদের প্রতিদিনকার ঘটনায় শিষ্টাচারের জায়গাটাতে যা ঘটছে, তা আমাদের দুঃখের ফিরিস্তিই বাড়াচ্ছে। যা ঘটেছে এর জন্য ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটা এখনো চলে যায়নি। কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া কারো মর্যাদাকে খাটো করে না বরং তাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সূত্র: ডেইলি স্টার

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)