ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮

ঢাকা সোমবার, ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১

খুলনা, জীবনযাপন যুদ্ধাহত হয়েও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঠাঁই হয়নি আকবর মিয়ার

যুদ্ধাহত হয়েও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঠাঁই হয়নি আকবর মিয়ার

মাহামুদুন নবী (মাগুরা), নিরাপদ নিউজ: বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষনে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণার পর ভারতের বানপুর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন মাগুরা মহম্মদপুরের আকবর আলী। ফরিদপুরের বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, ভাটিয়াপাড়া, মধুখালি এবং মাগুরার মহম্মদপুরসহ বিনোদপুর ও বাবুখালী এলায়কায় পাকিস্থানিদের সাথে বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এবং ১৯ নভেম্বর মহম্মদপুর উপজেলা সদরে সংগঠিত যুদ্ধে পাকিস্থানীদের ছোড়া বোমার স্প্রিন্টারে যোদ্ধাহত হন আকবর আলী। কিন্তু দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পার হলেও মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকায় নাম ওঠেনি তাঁর। তাঁর শেষ ইচ্ছ্া মরার আগে হলেও অন্তত মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকায় নিজের নামটা দেখে যেতে চান তিনি। ৪৭ বছর বুকের গভীরে পঞ্জিভুত সেই কষ্টের কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন মহম্মদপুর উপজেলার চররুইজানি গ্রামের ৭৫ বছরের প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী। মুক্তিযুদ্ধের একাধিক সনদ এখনো তিনি পরম মমতায় অতি যতœ করে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটু স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে থেকে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও কেউ এসে খোঁজ নেয়নি তাঁর । সহায়তার হাত বাড়িয়ে পাশে দাড়ায়নি কেউ। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে জানা যায় সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া সেই মুক্তিযোদ্ধার জীবন সংগ্রামের করুন ইতিহাস। স্ত্রী সন্তানসহ ৭ সদস্যের পরিবার নিয়ে অনেকটায় মানবেতর জীবন-যাপন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী। বাড়ির ১৫ শতাংশ জমি ছাড়া আর কোন জমি-জমা নেই তার । দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা কোঁঠায় বাংলাদেশ রাইফেলে তার চাকরি হয়। চাকরি থেকে অবসর নেন ১৯৯৯ সালের ১২ এপ্রিল। সে সময় পেনশনের টাকা দিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসবাসের জন্য। তারপরও পরিবার-পরিজন নিয়ে বেশ ভালই চলছিল তাঁর। কয়েক বছর পর থেকেই তার সংসারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ৩ মেয়েকে পাত্রস্থ করে এবং ৩ ছেলেকে লেখা-পড়া শিঁখিয়েও চাকরি দিতে পারেননি। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ, আর্মি এবং বিডিয়ারের মাঠে দাড়িয়েও অর্থাভাবে এবং উচ্চ মহলে যোগাযোগ করতে না পারায় তিন ছেলের এক ছেলেকের ভাগ্যে জোটেনি চাকরি নামের সোনার হরিণ। তারা এখন সংসারের বোঝা হয়ে বেকার অবস্থায় জীবন-যাপন করছেন। সরজমিনে আজ রোববার দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলীর বাড়িতে গিয়ে তার সাথে কথা বলে জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেই ভয়াল দিন গুলোর কথা। ভারতের বানপুর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে তিনি কমান্ডার আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে প্রথম যুদ্ধে অংশ নেন মাগুরার কামারখালিতে। মাত্র ১৮জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাকিস্থানিদের সাথে প্রথম সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে পরাস্থ করেছিলেন তাদের। ১১ অক্টোবর গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়ায় লেফটেনেন্ট জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ১০৪ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে হানাদার বাহিনির সাথে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। সর্বশেষ ১৯ নভেম্বর কমান্ডার তোজাম হোসেনের নেতৃত্বে মহম্মদপুরের যুদ্ধে ১০৮ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে পাক বাহিনির সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করেছিলেন তিনি। এ যুদ্ধে পাকিস্থানিদের গুলিতে তাঁর চোঁখের সামনে আহম্মদ হোসেন ও মহম্মদ হোসেন নামে দুই সহদর গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এ সময় হানাদার বাহিনির ছোঁড়া বোমার স্প্রিন্টার তার পায়ে লেগে গুরুতর আহত হন আকবর আলী। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৭ বছর সেই ক্ষত বয়ে বেড়িয়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি আবেদন করেছেন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজের নামটি আনতে। কিন্তু আজো সেই তালিকায় ঠাঁই হয়ান তার নাম। তিনি আরো বলেন, আবেদনের পরও ২০১৪ সালের যাচাই বাছাইয়ের চুড়ান্ত গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও নাম ওঠেনি তাঁর। আকবর আলী অভিযোগ করে বলেন, তালিকায় আজ হাজারো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম। অথচ, সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েও তিনি মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন নি। এ সময় তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার জীবনের অনেক দু:খ কষ্টের কথা অশ্রুভেজা চোঁখে জানালেন সমকাল প্রতিবেদক কে। মুক্তিযুদ্ধের একাধিক সনদ এখনো তিনি পরম মমতায় যতœ করে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন আঞ্চলিক কমান্ডার তোজাম হোসেন বলেন, আকবর আলী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমার নেতৃত্বে কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিরেন। কিন্তু ডুকুমেন্টারি কাগজ-পত্র সংগ্রহ করতে না পারায় মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় নাম উঠতে বাধাগ্রস্থ হয়েছে। তবে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হলে আমরা চেষ্টা করবো তাকে তালিকাভুক্ত করতে। মহম্মদপুর উপজেলা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার আলীরেজা খোকন অসুস্থ হয়ে ঢাকায় চিকিতসাধীন থাকায় এবং ডেপুটি কমান্ডার আব্দুল হাই হজ্ব পালনে সৌদি আরবে থাকায় তাদের মতমত নেওয়া যায়নি। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, আকবর আলীর বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানতে পেরেছি। সরকারি নির্দেশনায় যাচায় বাছায় প্রক্রিয়া স্থগিত আছে। এটা চালু হলে আমার মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় তার নাম আনতে চেষ্টা করব।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)