ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৫০ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ৭ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ২৪ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১

মতামত সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, সুষ্ঠু হয়নি

সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, সুষ্ঠু হয়নি

বাছির জামাল

বাছির জামাল

বাছির জামাল, ৩ মে ২০১৫, নিরাপদনিউজ: ‘তোরা যে যা বলিস ভাই/ আমার কিন্তু সোনার হরিণ চাই’রবি ঠাকুরের এই কবিতার চরণ কিংবা ‘বিচার মানি, তাল গাছ আমার’ বিচার-সালিশের এই প্রবাদের কথা তো সকল বাঙালির কাছেই মশহুর। ২৮ এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ এবং ‘এবারের নির্বাচনের মতো আর সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি’ বলে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে একেবারে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে উপর্যুক্ত দুটি লাইনের কথাই মনে হলো।
এবারের তিন সিটি নির্বাচন দেশের ভেতরের লোকদের চেয়ে বাইরের রাষ্ট্র ও নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বেশি। কেননা, নির্বাচনের আগ থেকে বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্র যেভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং নির্বাচনের পর যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাতে দেখা যায়, এ নির্বাচনের প্রতি ওই সংস্থা ও রাষ্ট্রসমূহের নজর ছিল। সাধারণত জাতীয় নির্বাচন ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তেমন কোন আগ্রহ থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশের এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি আন্তর্জাতিক বিশ্বেও আগ্রহের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে বিশেষত: বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারে না বলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট দাবি করে আসছে। এজন্য জোটটি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এই নির্বাচনের এক বছরপূর্তির দিন থেকে প্রায় তিনমাসব্যাপী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। পরে শিডিউল ঘোষিত হলে আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করে সিটি নির্বাচনের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। তাই এই নির্বাচনটি সুষ্ঠু হচ্ছে কিনা কিংবা হলেও বিরোধী দলকে নির্বাচনের প্রচারপ্রচারণায় সমান সুযোগ দেয়া হচ্ছে কিনাÑমূলত: এগুলোই বাইরের রাষ্ট্রসমূহ ও সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে।
কিন্তু নির্বাচনটি যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনঃপুত হয়নি, তা তাদের প্রতিক্রিয়া থেকেই বুঝা যায়। তারা নির্বাচনের ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন বলেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশনে প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রতারণায় পর্যবসিত হয়েছে। ভোট কারচুপির অভিযোগের তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনের দিন সংঘটিত অপকর্ম এবং অনিয়মের কারণে এ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে। সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, জালভোট ও নানা অনিয়মের মধ্যে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটে জালিয়াতির বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পেয়েছে তারা।
আর অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা অন্য রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে একধাপ এগিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তারা এবার সিটি নির্বাচনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিতেরও আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণে অনিয়ম, অবৈধ কর্মকা- ও সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্তের তাগিদ দিয়েছে দেশ দু’টি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে দেশ দু’টি ঢাকাস্থ দূতাবাস এ তাগিদ দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সদ্য সমাপ্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংঘটিত অনিয়ম, অবৈধ কর্মকা- ও সহিংস ঘটনায় অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা উদ্বেগ প্রকাশ করছে। চলমান পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিবিড় রাখার অন্যতম সেতু ছিল এ নির্বাচন -এমন মন্তব্য করা হয় বিবৃতিতে।
বিএনপি সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নির্বাচনের দিনই কারচুপি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে তিনটি সিটি নির্বাচনই বয়কট করেন। এছাড়াও এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্য প্রার্থীরা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুপুরের আগে ও পরে ভোট বর্জন করেন। সকাল সোয়া ১০টায় পুরান ঢাকার আমলীগোলা এএমসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর নির্বাচন বর্জনের কথা বলেন জাতীয় পার্টি সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সব কেন্দ্র সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে। ব্যালট বাক্স আগে থেকেই ভরে রাখা হয়েছে।
ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী জোনায়েদ সাকি বেলা দুইটায় সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ অনাস্থা ঘোষণা করেন। একই সময়ে পুরানা পল্টনের দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত দুই প্রার্থী ফজলে বারী মাসউদ ও আবদুর রহমান। এ ছাড়া চট্টগ্রামের তিন প্রার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মতিন, ইসলামী আন্দোলনের মো. ওয়ারেছ হোসেন ভূঁইয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও এই নির্বাচনকে তামাশা আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এসব কারণে নির্বাচনের পরদিন জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সমর্থিত সংগঠন আদর্শ ঢাকা আন্দোলন তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বাতিল ও একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবি তুলেছে।
কিন্তু সরকার সমর্থিত সংগঠন সহ নাগরিক কমিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছে। এ সংগঠনের সভাপতি সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হক চোখে কালো রোদ চশমা পরে বলেছেন, নির্বাচনটি অনেক উৎসবমুখর ছিল। কোন অনিয়ম কিংবা মারামারি হয়নি। যা হয়েছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি সিটি নির্বাচনের বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমগুলো ব্যর্থ হয়েছে বলেও দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা শুনার পর সৈয়দ শামসুল হককে এই প্রশ্নটি রাখার বড় ইচ্ছে হয়েছিল আমার। এখন এই সুযোগ তার কাছে জানতে চাই, তিনি কী চোখে রোদ চশমা পরেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছিলেন? তার কথাবার্তা শুনে আমাদের তাই মনে হলো। কারণ, তা না হলে কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিরোধী পক্ষের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ছিল না, থাকলেও মারধোর করে বের করে দেয়া হয়েছে, আনসার-ভিডিপির পোশাক পরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা সারাক্ষণ কেন্দ্র পাহারার দৃশ্য তার চোখ এড়াত না।
সৈয়দ শামসুল হকদের কথা কী বলব! ওরা তো বর্তমান সরকারের দলদাস বুদ্ধিজীবী ছাড়া কিছুই নয়। দুঃখ হয় যখন দেখি নিরপেক্ষতার নামাবলী গায়ে দিয়ে সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিরাও সিটি নির্বাচনের গুণকীর্তনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাংবাদিক সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের (একাংশ) সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলও সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে সনদ দেয়ায় পড়িমরি অবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো প্রথম থেকেই সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে জিগির তোলায় ব্যস্ত রয়েছেন। তিনি বলেছেন, সুষ্ঠু না হলে নির্বাচন বর্জন করার পরও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এত ভোট পায় কোথায়। এ প্রশ্ন অবশ্য সাধারণ জনগণেরও। শুরু হওয়ার তিনঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন বর্জন করার পরও বিরোধী পক্ষের প্রার্থীরা এত ভোট পায় কিভাবে! নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বুঝানোর জন্যই সরকারের লোকেরা বিরোধী প্রার্থীদের ভৌতিক ভোট দেখিয়েছে। এতে নির্বাচন কমিশনেরও সায় রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থী, দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন একযোগে বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, তখন সরকার ও তার বশংবদরা নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বাঁশি বাজিয়েই যাচ্ছেন। এ থেকে রবি ঠাকুরের ওই কবিতার চরনের কথাই মনে পড়ে, তোরা যে যা বলিস ভাই/আমার কিন্তু সোনার হরিণ চাই।- আমার দেশ থেকে সংগৃহীত
লেখক: সাংবাদিক-গবেষক

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)