আপডেট ১৬ মিনিট ৪১ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১২ রবিউস-সানি, ১৪৪১

নিসচা সংবাদ, লিড নিউজ ‘সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের করণীয়’ শীর্ষক নিসচা’র গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

‘সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের করণীয়’ শীর্ষক নিসচা’র গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

নিরাপদ নিউজ : আজ রবিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসিআই মোটরস এর সহযোগিতায় সমকাল ও নিরাপদ সড়ক চাই’র (নিসচা) আয়োজনে এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সঞ্চলনায় গোলটেবিলে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, নিসচা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন, হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান, সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দীন আহম্মেদ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী, ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তর ট্রাফিকের উপ-কমিশনার প্রবীর কুমার রায়, ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রয়াত সাংবাদিক মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলী কাজী, এসিআই মোটরস এর বিজনেস ম্যানেজার রবিউল হক। ধন্যবাদ বক্তব্য দেন নিসচা’র মহাসচিব সৈয়দ এহসানুল হক কামাল।

গোলটেবিল আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন নিসচা’র যুগ্ম মহাসচিব লিটন এরশাদ, সাদেক হোসেন বাবুল,বেলায়াত হোসেন খান, গণি মিয়া বাবুল,সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আজাদ হোসেন, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমান,আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মিরাজুল মইন জয়,দপ্তর সম্পাদক ফিরোজ আলম মিলন,কার্যনির্বাহী সদস্য কামাল হোসেন খান ও শিক্ষার্থী ইউনিটের সাকিব হোসেন।

‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, আমরা দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই। আমরা চাই, কোনো চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাবেন না, সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি থাকবে না, লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালক গাড়ি চালাবেন না এবং সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চলবেন। সরকার সবক্ষেত্রেই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। নতুন সড়ক আইন নিয়ে যতোই প্রশ্ন উঠে আসুক, আমরা চাই পরিবহন সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা এ আইন মেনে চলবেন। আজকে তারা বিভিন্ন কথা বলছেন, কালকেই তারা সেটি মেনে চলবেন। আমরা সেই অপেক্ষায় থাকবো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আরো বলেন, আইন করে জরিমানা আদায় মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, বরং সরকার চায় সবাই আইন মেনে চলুক। নতুন সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই প্রধান উদ্দেশ্য। এসময় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ১১১টি প্রস্তাবনা ও এ ব্যাপারে টাস্কফোর্স গঠনের কথাও উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছি। খুব শিগগিরই এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করবো। প্রত্যেকটি প্রস্তাবনা আলোচনা সাপেক্ষে একে একে বাস্তবায়ন করা হবে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আড়াই দশক আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদকপ্রাপ্ত ইলিয়াস কাঞ্চন প্রারম্ভিক বক্তব্যে ২০১৬ সালে পাশ হওয়া সড়ক পরিবহন আইন এর খসড়ার পূর্বের পেক্ষাপট তুলে ধরেন। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি করা হলেও তার কার্যকারিতা ঝুলে ছিল। গত বছর অগাস্টে আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট প্রকাশ হয়। এরপর বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর শুরু হয়।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন এই আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে বলা হয়েছে কিন্তু সর্বনিম্ন শাস্তি কি তা তুলে ধরা হয়নি। তিনি এমন অনেক গুলো আইনের ধারা উল্লেখ করে তার সঙ্গতি অসঙ্গতি গুলো তুলে ধরেন। সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের পরও ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদে। বারবার ছাড় দেওয়া হলে মানুষের মধ্যে আইন মানার মানসিকতা থাকে না বলেও উল্লেখ করেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, একটি বাস রাস্তায় চললে দিনে ১০ হাজার টাকা আয় হয়। ৫০০ টাকা জরিমানা দিয়ে তাই ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে চলত। এখন আর সেইসব সুযোগ এখানে নেই। নতুন আইনে কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অবহেলা দুর্ঘটনা ঘটলে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়াও ইলিয়াস কাঞ্চন আরো বলেন নতুন এই আইনে শুধু যে চালকদের জন্য জরীমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। এখানে চালক,মালিক,যাত্রী/পথচারী সকলের জন্য আইনে নিয়ম ভঙ্গকারির জন্য জেল জরিমানার কথা উল্লেখ রয়েছে। আইন না মানা এই সংস্কৃতি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা শাস্তির আওতায় আসা অবধারিত। ইলিয়াস কাঞ্চন সড়কে চলাচলে সকলকে সচেতন হতে আহবান জানান।নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন , সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের মদ্ধদিয়ে সড়কে দুর্ঘটনা কমবে বলে আমরা আশাবাদী।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, সমকাল শুধু সংবাদ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। সমাজ সচেতনতায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। সড়কে মৃত্যু বন্ধে, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সমকাল সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে। তারই অংশ হিসেবে গোলটেবিল আলোচনায় অংশীজন হয়েছে।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, নতুন যে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ টি করা হয়েছে এই আইনেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।তবে সিটি সম্ভব এর আগে সাধারন মানুষকে সচেতন হতে হবে।কারণ রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮%পথচারী নিহত হয়। এই মানুষগুলো নিয়ম মেনে পথ চলেনা।আবার কখনো দেখা যায় অনেক স্থানে পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটওভার ব্রীজ,আন্ডারপাস এসব এর সংকট রয়েছে।এজন্য এসব কিছু যদি যথাযথ ভাবে প্রতিস্থাপন করা হয় পথচারীদের চলাচলের পথ নিরাপদ করে তোলা যায় তোলা যায় তাহলে এই দুর্ঘটনার হার অনেকটা কমে আসবে।পাশাপশি বিআরটিএতে ভোগান্তি দুর করতে হবে।তিনি সড়ক নির্মাণে সঠিক ডিজাইন এর মাধ্যমে কাজ করার কথা বলেন।তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু বিষয় তুলে ধরেন।অবৈধ গাড়ি পার্কিং তুলে দিতে হবে।এবং যেখানে পার্কিং দরকার সেখানে গাড়ি পার্কিং নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন দেশে অনেক অবৈধ লাইসেন্সধারি চালক রয়েছে এই লাইসেন্স গুলো আসে কোথা থেকে এবং কিভাবে।এখানে বিআরটিএর কোন দালাল চক্রের হাত আছে কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।এবং সঠিকভাবে বৈধ লাইসেন্স প্রদানের সু-ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব পালনে শতভাগ সততা থাকতে হবে বলে জানান।

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন,বিধি প্রনয়ন করে আইন বাস্তবায়ন করতে হবে এমন কোন কথা নেই। নানা সময়ে নানা কারণে অনেক আইন তৈরী হয়েছে কিন্তু সেগুলো এখন বিধি প্রনয়ন হয়নি।কিন্তু সে আইন গুলো যথাযখভাবে পালন করা হয়েছে।তিনি বলেন মূল বিষয় হলো আইন মানার প্রবনতা।আমরা আইন অমান্য করব না এই মানুসিকতা তৈরী করতে হবে। আমাদের প্রয়োজন ওরিয়েন্টিশন। আমার মতে সকলে আইনকে শ্রদ্ধা জানালে আইনের বিধি মালার প্রয়োজন লাগবে না। তিনি আরো বলেন, এই আইনে শাস্তির বিধান যেটাই দেয়া থাক আমরা যদি আইন মেনে চলি তাহলে শাস্তির ভয় কিসে।আমাদের সকলকে সঠিক ভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবেই।তিনি আরো বলেন, উন্নতদেশগুলোতে সীথিলতা দিয়ে নয় কঠোরতা দিয়ে মানুষকে আইন মানতে অভস্থ করানো হয়।যেখানে ওভারব্রীজ থাকবে ফুটপাত থাকবে সেগুলো তাদের মানতেই হবে। তিনি সড়কের অবকাঠামগত উন্নয়ন চেয়ে বলেন,সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে যেন চলাচলে কোন পতিবন্ধকতা না থাকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, এই আইনকে যথাযথভাবে প্রযোগ এর জন্য আমরা নিজেরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছি জনসাধারনকে আইন সম্পর্কে জানাচ্ছি এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা প্রচারনামুলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আইনটি মানার জন্য আমরা নিয়মিত ট্রফিক পক্ষ কর্মসূচি পালন এর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা আশাবাদী এই আইনটি সঠিক ভাবে সকলে মেনে চলবেন।

বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান বলেন, বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়োর ক্ষেত্রে এই যায়টিকে আরো সচ্ছ করে তুলতে হবে। এবং চালকদের লাইসেন্স দেয়ার অথরিটির যে যায়গা যেখানে শুধু বিআরটিএ কে দেয়া হয়েছে এখানে শুধু বিআরটিএ নয় বিআরটিএ অনুমোদিত যেকোন সংস্থা লাইসেন্স দিতে পাবরে সে বিষয়ে মেয়রের প্রতি আহবান জানান।

সড়ক পরিবহন আইনকে মালিকবান্ধব বলে আখ্যা দেন মঞ্জুলী কাজী। তিনি বলেছেন, আইনের ১০৫ ধারায় বলা হয়েছে দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় বিচার হবে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা বলা হয়েছে ৫ বছর জেল। প্রাণহানির ক্ষেত্রে জরিমানার যে অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে তা নগণ্য। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে, তার পরিবারের যে দুরাবস্থা হয়, তা এই সামান্য ক্ষতিপূরণে পূরণ হবার নয়। যাত্রীর জন্য বিমা সুবিধা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

এর জবাবে খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, মালিক শ্রমিকরাই নতুন আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু যে আইন পাস হয়েছে, তাতে তাদের দাবি টেকেনি। এই আইন মালিকদের আইন না। মালিক শ্রমিকরা এদেশেরই মানুষ। ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আইনে ট্রাস্ট গঠনের কথা বলা হয়েছে। গাড়ির বিমার টাক ট্রাস্টের তহবিলে জমা দিলে হাজার কোটি টাকা হবে। তা দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে। সড়কে মৃত্যুতে ৫ বছর সাজা কম- এ বক্তব্যের জবাবে খন্দকার এনায়েত বলেন, এ বিষয়ে ভুল বার্তা যাচ্ছে। যদি প্রমাণ হয় চালক ইচ্ছা করে কাউকে মেরেছেন, তাহলে ৩০২ ধারাতেই মামলা হবে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড।

আইনের তিনটি ধারা জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। এর সংশোধন চেয়ে খন্দকার এনায়েত বলেন, এমনিতেই চালক সঙ্কট। চালকদের যদি ধরে জেলে রাখা হয়, তবে গাড়ি চালাবে কে?

যত্রতত্র সড়ক পারাপার ও ফুটপাথ ব্যবহার না করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এরও সংশোধন দাবি করে এনায়েত উল্যাহ বলেন, সড়কে হাঁটে গরিব মানুষ, শ্রমিকরা, বড়লোক গাড়িতে চড়ে। যদি গরিব শ্রমজীবী মানুষদের এত বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়, তবে তাদের মাসের পুরো আয় চলে যাবে জরিমানা পরিশোধে।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জরিমানা আদায় করা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, সরকার চায় সবাই আইন মেনে চলুক। নতুন সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা প্রধান উদ্দেশ্য। আইনের উদ্দেশ্য সড়কে যেনো ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন চালক না থাকে।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সমালোচনা আসলেও সকলের মধ্যেই আইন মানার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষায় কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বিআরটিএতে এখন প্রচণ্ড ভিড়। আইন মানার মানসিকতা আছে বলেই, এ ভিড়। আজকে যারা নানান কথা বলছেন, কাল তারাই মেনে চলবেন।

মন্ত্রী বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাস হয়ে গেছে, এ নিয়ে এখন কিছুই করার নেই। কিছু করতে হলে আবার সংসদে যেতে হবে। পরিবহন মালিক শ্রমিকরা আইন সংশোধনের যে দাবি জানাচ্ছেন, তা সরকার যদি যৌক্তিক মনে করে তাহলে বিবেচনা করবে। মালিক শ্রমিকরা আইন মেনে অতীতে সরকারকে সহযোগিতা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে।

চালক ইচ্ছা করে দুর্ঘটনা ঘটালে তাহলে ৩০২ ধারায় মামলা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সড়ক পরিবহন আইন জামিনযোগ্য করার দাবির জবাবে তিনি বলেছেন, জামিনের এখতিয়ার আদালতের। চালকের ভূমিকা পর্যালোচনা করে বিচারক জামিন দিতে চাইলে দেবেন।

দেশে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে বলে পরিসংখ্যান দিয়ে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, কিডনি, হৃদরোগে যত মানুষের মৃত্যু হয়, সড়কে তারচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়। ক্র্যাশ কর্মসূচির মাধ্যমে বিআরটিএ চালক সঙ্কট সমাধান করবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

যত্রতত্র সড়ক পারাপার ঠেকাতে ঢাকায় চলন্ত সিঁড়িযুক্ত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনার তুলে ধরেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। পথচারী, চালক, শ্রমিকদের জন্য অত্যধিক জরিমানার বিধান রয়েছে আইনে, এ সমালোচনার জবাবে মেয়র বলেন, আইন বাস্তবায়নে যা করার, করতে হবে। যখন পরিবর্তন হবে, তখন হবে। কিন্তু যতক্ষণ আইন আছে, ততক্ষণ মেনে চলতে হবে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে সড়ক পরিবহন আইন। আইন কার্যকরের পর ১৪ দিন ছাড় দেওয়া ঠিক হয়নি। বরং আগে সচেনতা অভিযান চালিয়ে তারপর আইন কার্যকর করা উচিত ছিল।

অবৈধভাবে আকার প্রকৃতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে গাড়ির ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী তোফাজ্জল বলেন, বিদেশে মেশিনের মাধ্যমে মালামাল তোলা হয়। বাংলাদেশ মাল লোড আনলোড করে শ্রমিকরা। এ কারণে কাভার্ড ভ্যানের দৈর্ঘ ২০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ২২ ফুট করা হয়। এতদিন এই দৈর্ঘ্যেই ফিটনেস পেয়েছেন। এখন তারা কীভাবে এই বাড়তি অংশ কাটবেন। আকৃতি পরিবর্তনে ৩ লাখ টাকা জরিমানা ধরা হয়েছে। এত জরিমানা দিয়ে গাড়ি চালানো সম্ভব না। চালকরা সব বাড়ি চলে গেছে। কেউ গাড়ি চালাতে রাজি নয়।

আইনে অনেক ত্রুটি রয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিক নেতা ওসমান আলীর। তিনি বলেছেন, আইন কার্যকর হয়ে গেছে, অথচ ট্রাস্ট গঠিত হয়নি। মৃত্যুর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ৩০৪ (খ) ধারায় যাই থাকুক না কেনো ৫ বছর জেল হবে। প্রকৃত দুর্ঘটনাতেও কারো মৃত্যু হলে কি ৫ বছর জেল হবে! এই আইন দিয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে, কিন্তু সড়কে স্বস্তি দেওয়া যাবে না। আইনে শ্রমিকদের সুরক্ষা নেই।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, আইনের সীমাবদ্ধতা না খুঁজে, কীভাবে আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই পথ খুঁজতে হবে। আইনে অনেক কিছু নেই, যা বিধিমালায় স্পষ্ট হবে। বিধিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইন প্রয়োগ করে। সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য আইনটি তফসিলভুক্ত হয়নি। যা দুই একদিনের মধ্যেই হয়ে যাবে। এরপর বিআরটিএ কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগে যাবে।

তিন বছর ধরে চালক প্রশিক্ষণ স্কুল পরিচালনা করছে এসিআই মোটরস। প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ম্যানেজার রবিউল হক এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সড়কের নিরাপত্তায় চালকের প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসিআই চালক সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। দক্ষ চালক থাকলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)