ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ১ মিনিট ২২ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ৮ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ২৫ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১

ফিচার হিজড়াদের জন্ম নিছক প্রকৃতির ‘পরিহাস’!

হিজড়াদের জন্ম নিছক প্রকৃতির ‘পরিহাস’!

হিজড়া

হিজড়া

নিরাপদ নিউজঃ হিজড়া সম্প্রদায়ের মানবগুলো আগেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও জন্মাবে। সেহেতু প্রতীয়মান হয় যে, মানব সমাজ যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত হিজড়া সম্প্রদায় অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকবে। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্যের হিজড়া সম্প্রদায় জন্মের জন্য কোন মতেই তারা দায়ী নয়। এমনকি তার পিতামাতাও দায়ী নয়। এটা নিছক প্রকৃতির একটি পরিহাসমূলক কর্মকাণ্ড। জীববিজ্ঞানীগণ এই তৃতীয় লিঙ্গের বা হিজড়া মানব সন্তান জন্মের রহস্যকে এখন পর্যন্ত উন্মোচন করতে পারেননি। তারা একে কেবল বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোন একটা সঙ্কট বা বাড়তি বা ঘাটতি বলে ক্ষান্ত হয়ে বসে না থাকলেও তেমন কূল কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। উল্লেখ্য যে, হিজড়া সন্তানের জন্মের পর আধুনিক চিকিৎসায় বা অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে কোন লিঙ্গের অধিকারী হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়ার ব্যাপারটা জটিল হলেও সম্ভব। কিন্তু নানা কারণে অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টার পরও প্রতিবন্ধকতার কারণে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ফলশ্র“তিতে হিজড়া সম্প্রদায় একই বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও অন্য ছেলে-মেয়েদের মতো সম্মানযোগ্য অবস্থানে নেই। তারা প্রচলিত মানব সমাজের, রাষ্ট্রের ও পরিবারের কাছে হচ্ছে সদানিয়ত বৈষম্যের শিকার।
প্রধানত এদের দুটি বৈশিষ্ট্যগত ধরনঃ যেমন- ক) প্রকৃতিদত্ত এবং খ) মানুষের হাতে সৃষ্ট। সারা পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ধরন প্রায় একই। তবে জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসাবিদরা লৈঙ্গিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ছয়টি ধরন চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু মানুষের হাতে সৃষ্ট লৈঙ্গিক বিকৃতিগ্রস্ত হিজড়াদের ধরন ও জীবন পরিণতি স্থানীয় সংস্কার ও নিয়ম, সামাজিক প্রথা এবং আর্থ-সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। কিছু হিজড়াকে অকুয়া বলা হয়, যারা শরীরীভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারী স্বভাবের। প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসা বিজ্ঞানে হিজড়া কথাটি আমাদের সমাজেরই তৈরি। বাবা মা দু’জনের জিনঘটিত সমস্যা থাকলে, তাদের শিশু হিজড়া হতে পারে। এক্ষেত্রে বাবা মা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু উভয়ের কাছ হতে ত্রুটিপূর্ণ জিন পাওয়ায় শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর শরীরে হরমোনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
অল্প বয়সে রোগ ধরা পড়লে এর চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের হিজড়া শিশুদের ব্যাপারে সচেতনতার অভাব রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষ জানেই না যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিজড়াদের চিকিৎসা এদেশেই সম্ভব। ছোট বেলাতেই হিজড়া শিশুকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে রয়েছে। এটা না করে তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে এরাও অন্য দশজনের মতো যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বাস করতে পারে। অথচ হিজড়া শিশুর জন্ম দেয়ায় অধিকাংশ বাবা মা ও পরিবার সামাজিকভাবে লজ্জা ও গ¬ানিতে ভোগেন, ফলে একটা বড় অংশ সম্পূর্ণ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থাকে। সাধারণ বাংলাদেশে হিজড়ারা নিজেদের একটি আলাদা সমাজ তৈরি করে বসবাস করছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিজড়া সমাজ একই ধারায় গড়ে উঠেছে। এই উপমহাদেশের মতো হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
ইউরোপসহ পাশ্চাত্য বিশ্বে হিজড়া বা জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধীরা তাদের পরিবারের সাথেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও সঙ্গী খুঁজে নিয়ে সংসার করে। প্রায় উন্নত দেশে হিজড়াদের উপর সামাজিক ও পারিবারিক সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে হিজড়াদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বিদ্যমান। যেহেতু তারা নিজেদের মধ্যে আলাদা চাল-চলন, আইন-কানুন, এমনকি নিজস্ব জীবনযাত্রার ভাষা তৈরি করে মূলস্রোত থেকে সরে গিয়ে গড়ে তুলেছে এক স্বতন্ত্র উপ-সমাজ। পরিশেষে এই কথাই বলবো যে, সমাজের সাধারণ মানুষের বিরূপ আচরণ হিজড়াদের রাজনৈতিক নাগরিক ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। হিজড়াদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা ভোট দেয়ার মতো নাগরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ বোধ করে না। অন্যদিকে কটুক্তিসহ নিরাপত্তাহীনতা হিজড়াদের আর একটি সমস্যা। আর এ কারণেই পুলিশ থেকে শুরু করে মাস্তানদের হাতে বিভিন্নভাবে নাজেহাল নির্যাতিত হতে হয়। যাহোক, বর্তমান সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তাদের নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে এবং তাই আশা করবো এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। হিজড়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, প্রকারান্তরে স্বাভাবিক জীবনে আসতে সহায়তা করবে এবং সেই মানসে সবাই যদি এগিয়ে আসে, তাহলে হিজড়াদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি। (লেখক : গবেষক, মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব)

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)