ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৫

ঢাকা রবিবার, ৬ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ২২ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১

মতামত হেরে গেছে বিএনপি

হেরে গেছে বিএনপি

নাদীম কাদির

নাদীম কাদির

নাদীম কাদির, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, নিরাপদনিউজ : গত বুধবারের দুটি লেখা দেখে আমার কাছে পরিষ্কারভাবে মনে হলো, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তার সন্ত্রাসী-যুদ্ধে হেরে গেছে এবং তাদেরকে এর পরিণতি মেনে নিতে হবে। কিন্তু এই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাকে অবশ্যই জানতে হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন রাজনীতির নামে এ ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নমনীয়তা দেখাচ্ছেন? তার জানা উচিত, এদেশের ‘দুর্ভাগা’ জনগণ তাকে বিএনপি এবং এর জোটসঙ্গী সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। দুনিয়ার কোনও জাতিই সন্ত্রাসবাদের কাছে মাথা নত করেনি এবং সেভাবেই প্রধানমন্ত্রীরও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দৃঢ় থাকা আবশ্যক।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবশ্যই সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে হবে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে পরাস্তা করতে তাদেরকে অনেক সমাবেশ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এবার লেখাগুলোর বিষয়ে আসছি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম মাহবুবুর রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন শেষে জনপ্রিয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে তার অনুভূতি সম্পর্কে লিখেছেন। এতে তিনি বলেছেন, নিরীহ মানুষকে যারা হত্যা করেছে তারা পশুর চেয়ে অধম। তিনি লিখেছেন যে, এই ব্যথা অসহনীয়।
জেনারেল মাহবুব একজন সাবেক সেনাপ্রধান। তিনি ব্যাপকভাবে একজন যুক্তিনির্ভর মানুষ হিসেবে পরিচিত এবং অধিকাংশ অন্যান্য রাজনীতিবিদের চেয়ে আলাদা। ওই নিবন্ধের জন্য আমি তাকে টেলিফোন করে ধন্যবাদ জানাই। আমি তাকে বলি, এই নিবন্ধ দেখিয়েছে ২০ দলীয় জোটে অন্তত একজন মানুষ আছেন যার যৌক্তিক কথা বলার সাহস আছে। উত্তরে জেনারেল মাহবুব বললেন, এটা রাজনৈতিক লেখা নয় বরং একজন মানুষ হিসেবে তার কিছু অনুভূতি। এই অপরাধীরা কিভাবে এমন নির্মম ও অমানবিক হতে পারে? এটি অগ্রহণযোগ্য।
তবে যখন বললাম যে, তিনি কেন এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে উপলব্ধি করাচ্ছেন না তখন তিনি কৌশলে উত্তর এড়িয়ে গেলেন। বললেন, অপরাধী যেই হোক, তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। কিন্তু এই অপরাধীরা কারা এবং তাদের মিথ্যাই হচ্ছে সমস্যা। পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীরা বলছে, এইসব ‘অপরাধীরা’ ছাত্রশিবির ও বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মী। গ্রেফতারকৃতদের তালিকা অনুযায়ী একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলছে সব গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। কিন্তু বিএনপি দাবি করে আসছে তাদের লোকজন এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়।
দ্বিতীয়ত, ডেইলি স্টার পত্রিকার এক বিশ্লেষণে প্রথমবারের মতো সরাসরি বলা হয়েছে, চলমান বোমাবাজি সন্ত্রাসবাদের চেয়ে কম কিছু নয়। আমরা কি আসলেই আল কায়েদার প্রতিহিংসাত্মক বোমা হামলা এবং ইরাক, পাকিস্তানসহ অন্যত্র বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দ্বারা বাসে আগুন দিয়ে ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করার মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখতে পাই? সেটা যদি না হয়, তাহলে গত এক মাস ধরে আমরা কি দেখছি – নিরপরাধ নাগরিকদের নির্দয়ভাবে হত্যা করা – এটা সন্ত্রাসবাদের চেয়ে কম কিছু নয়।
পত্রিকার প্রথম পাতার এ বিশ্লেষণে সৈয়দ আশফাকুল হক আরও বলেন, … সন্ত্রাসবাদের ব্যাপকভিত্তিক সংজ্ঞা হচ্ছে, রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে বিশেষ করে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতার ব্যবহার বা সহিংসতার হুমকি। সুতরাং, আমরা যদি এই সংজ্ঞায় যাই, এখন আমরা কি রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখোমুখি হচ্ছি? এ নিয়ে তিনি একটি অত্যন্ত বৈধ প্রশ্ন করেছেন। বলেছেন, জামায়াতের মতো সন্ত্রাসের তকমা বিএনপির রাজনৈতিক মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।
তিনি স্পষ্টতই আমার মতো ভাষায় কঠোর হাতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ ‘শোচনীয়ভাবে মানুষকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে’। ধন্যবাদ হক সাহেব। বিএনপি ও জামায়াত রাজনীতির নামে কী শুরু করেছে? তারা মানুষ হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ এবং জনগণকে রাজনীতিবিমুখ করার নতুন প্রবণতা চালু করেছে। অর্থাৎ, এতে অসাংবিধানিক শাসনকে উৎসাহিত করা হবে।
একটি নিরাপত্তা সংস্থায় কাজ করার পর এক তরুণ বিশ্লেষক আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন, বিএনপি-জামায়াতের কৌশল বাংলাদেশের রক্তাক্ত রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনবে, যদি না সরকার এই কৌশলকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে না পারে। বিএনপির তথাকথিত নির্বাচনের দাবি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের সন্ত্রাসের কৌশল এখন উদ্বেগের কারণ।
প্রকৃতপক্ষে এক মাসের সন্ত্রাসবাদের পর খালেদা জিয়া তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে স্বাচ্ছন্দ্যেই আছেন। বিএনপি-জামায়াত না তাদের দাবির বিষয়ে এক ইঞ্চি সামনে এগোতে পেরেছে আর না জনগণের দিক থেকে সরকারকে ঘৃণা করাতে পেরেছে। আমি আগেও লিখেছিলাম যে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দেওয়াটা ছিল ভুল এবং এখন এসএসসির সময় হরতাল ডাকাটা গণবিরোধী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। সাংঘাতিক সব ভুলের পর আপনারা ক্ষমতার জন্য তড়িঘড়ি করতে পারেন না। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আসতে আওয়ামী লীগকে ২২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
ওই তরুণ বিশ্লেষক আমাকে জানাল, বিএনপি যেকোনও মূল্যে অথবা ওয়ান ইলেভেনের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করানোর চেষ্টা করছে। বাস্তবতা থেকে যা বহু দূর। শেখ হাসিনার শাসনামলের ছয় বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বিএনপির আরেকটি হাতিয়ার হলো ভিত্তিহীন সব গুজব। যার মধ্যে কয়েকটি হলো এমন- ভারত হাসিনা সরকারকে নিয়ে অসন্তুষ্ট। বারাক ওবামা নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে বলেছেন এবং আর্মি জেনারেলরা গোপনে বৈঠক করছেন!
বিএনপি জামায়াতের সর্বশেষ অবলম্বনটা হলো টার্গেটেড কিলিং তথা বেছে বেছে হত্যাকাণ্ড। অনেকেই বলে থাকে, যখন কেউ ডুবে যেতে থাকে তখন সে তার বিপরীত পক্ষের যতটা সম্ভব ক্ষতি করে যাওয়ার চেষ্টা করে। টিভি টক শোতেও বিএনপির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব স্পষ্ট। যারা বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে বলতে আসেন, তারা আমতা আমতা করতে থাকেন এবং বোমা হামলায় নিরীহ মানুষ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন। একদিকে তারা বলেন যে, কারা এসব হামলা করছে তা তারা জানেন না, অন্যদিকে এসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানো ও তা থামানোর আহ্বানও তারা জানান না।
বিএনপি-জামায়াতের এটা জানা দরকার যে সাবেক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের পতন ঘটাতে একতাবদ্ধ বাংলাদেশের ৯ বছর লেগেছিল। তাই, দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা কি আদৌ সম্ভব হবে? রাজপথে সুশীল সমাজ ও পেশাজীবী মানুষেরা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার। অবরোধ আর হরতালকে উপেক্ষা করে উপার্জন করতে না পারলে অতিসত্ত্বর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করবে শ্রমজীবীরাও। ইতিমধ্যে বোমা নিক্ষেপকারীদের প্রতি দারুণ ক্ষেপে আছে সাধারণ জনগণ। কে জানে, এই ক্ষোভ হয়তো পরে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের দিকেই গড়াবে। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে কেউ হয়তো খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাও করে বসতে পারে। –এবিনিউজ (সংগৃহীত)
লেখক : সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার ও লন্ডন হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)