ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৩১ মিনিট ২৮ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৭ রবিউস-সানি, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয় ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা

১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা

উপসম্পাদকীয়

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু,নিরাপদ নিউজ : সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আধিপত্যবাদ, নব্য ধনিক, বণিক, পুঁজিবাদ ও রক্ত চোষা দানব শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে খামোস কণ্ঠের অকতোভয় সংগ্রামী দিকপাল, গণমানুষের মহান নেতা, আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাত ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এবারের ১৭ নভেম্বর মহান নেতা মওলানা ভাসানীর ৪১তম মৃত্যু বার্ষিকী।

যেখানে যে অবস্থাতেই থাকিনা কেন, বন্ধু বান্ধব, স্বজন ও মওলানা ভাসানীর এক সময়ের রাজনৈতিক অনুসারী ও গুণগ্রাহীদের নিয়ে প্রতি বছরই ১৭ নভেম্বর প্রাণপ্রিয় মহান নেতার মাজার জেয়ারত করে থাকি। ওনার মৃত্যুর পর ৪০ বছর যাবত কোনদিনই টাঙ্গাঁইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত বাদ পড়েনি। এবারও দুটি মাইক্রোবাসে মওলানা ভাসানীর মুরিদ, শিষ্য, ভক্ত ও রাজনৈতিক অনুসারীরা আফ্রো এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার সর্বহারা মানুষের নয়নমনি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত করতে ভুল হয়নি। ১৭/১১/২০১৭ ইং শুক্রবার টাঙ্গাইল শহরের অনতিদূরে কাগমারি মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের কাছে আমাদের মাইক্রোবাস দুটি সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছে।

সে সময় মাইক্রোবাস দুটি অগনিত ছাত্রজনতার মিছিল ডিঙিয়ে কোন ভাবেই সামনে এগুতে পারছিলনা। তাছাড়া সেই সময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাজার জেয়ারতের উদ্দেশ্যে আসা অনেক বাস, মাইক্রো, জীপ, কার, অটো, সিএনজি সহ অন্যান্য যানবহনের যানঝট সৃষ্টি হয়। তখন রাস্তার দুইপাশের ছাত্র জনতার মিছিল থেকে গগণ বিদারী শ্লোগানে, শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে।

সবার মুখেই ছিল যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা ভাসানী, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ নিপাত যাক, মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ। এমনিভাবে কোন মতে রাস্তার দুই পাশের ছাত্র জনতা ও গণ মানুষের মিছিল ও রাস্তার যানঝট অতিক্রম করে মওলানা ভাসানী কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট দিয়ে মুকুটহীন সম্রাট মওলানা ভাসানীর মাজারের অনতিদূরে গাড়ী রাখার স্থানে গিয়ে পৌঁছা হল। ৫ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে ১ ঘন্টারও বেশী সময়

অতিক্রান্ত হয়। ফুলের তোড়া নিয়ে মাজারে ঢুকার সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, লেখক, সাহিত্যিক, ডাক্তার, অধ্যাপক বিভিন্ন দলের অগনিত রাজনৈতিক নেতা, কর্মি, মুরিদ, ভক্ত এবং তার অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক অনুসারীদের দৃষ্টিতে আসে। এ নিবন্ধে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করলে, নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় সেদিকে আর অগ্রসর হলাম না। মাজার জেয়ারত করতে দেখা যায় মাজারে যেমনি মৌন অবস্থা বিদ্যমান, তেমনি সকলের চোখে অশ্রুধারা।

কেহ মোনাজাত করছে, কেহ বা কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন এবং কেহ নফল নামাজে রত। মহান নেতার পাশেই তার সহধর্মিনী জয়পুর হাটের পাঁচ বিবির এক সময়ের জমিদারের কন্যা বেগম আলেমা ভাসানী বা দাদু ভাসানীর মাজার রয়েছে।

মূল মাজার থেকে ২০০ থেকে ২৫০ গজ দূরে দক্ষিণে রাস্তা ও পুকুর পাড়ে পুত্র আবু নাসের খান ভাসানীর কবর এবং অনতিদুরে মওলানা ভাসানীর কনিষ্ট পুত্র কিবরিয়া ভাসানীর কবর। মাজার থেকে বেড়নোর পথে মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ দিনের হিন্দু মুসলীম ভক্ত, অনুরক্ত, মুরিদ, শিষ্যসহ তাদের সাথে থাকা তাদেরই ছেলেমেয়ে ও স্বজনরা মাজার জেয়ারতকারীদের হাতে বিভিন্ন ফুল, তবারক, বিভিন্ন ধরণের লিফলেট বিতরণ করছে এবং অনুরোধ জানিয়ে বলছে, আপনারা সকলেই প্রতি বছরই হুজুর ভাসানীর মাজার জেয়ারত করতে আসবেন।

আমরা আপনাদের কাছে কিছুই চাইনা, আমরা চাই হুজুরের জন্য আপনাদের ভালোবাসা এবং দোয়া। এই দৃশ্য স্বচক্ষে না দেখলে, বাস্তবিকই দু কথা লেখে বুঝানো খুবই কঠিন ও অসাধ্য। মাজারের পাশেই দূরদুরান্ত থেকে আসা সকল শ্রেণী পেশার লোকদের জন্য তবারক হিসেবে খিচুড়ির ব্যবস্থা ছিল। ছোট, বড়, ধনী, গরীব, কাঙ্গাঁল একসাথে মাঠির শানকিতে খিচুড়ি খাওয়ার দৃশ্যও যেন ভুলে যাওয়ার নয়। তবে এখানে বলে রাখা দরকার মাজার সম্পর্কে অনেকের বিভিন্ন ধরণের ধারণা রয়েছে। এ ধারণা থেকে নিবদ্ধক হিসেবে নিজেও বাহিরে নই। তবে মওলানা ভাসানীর মাজারে বেদাত বা কোরআন সুন্নাহর বাইরে বা ইসলাম ও শরীয়তের বিধানের বাইরে কোন কিছু করার সুযোগ নেই।

এমনকি একশ্র্রেনীর ভন্ডদের মতো খাজা বাবার দরবার শরীফ বানিয়ে আয় রোজগার ব্যবস্থা করারও কোন সুযোগই এখানে অবশিষ্ট নেই। মাজারের প্রায় ১০০ গজ দক্ষিণে যেখানে মওলানা ভাসানী সভা সমাবেশ করতেন (দরবার হল বলে আখ্যায়িত) সেই বিশাল আয়তনের দরবার হলে মুরিদ ও ভক্তরা বাউলগান, পালাগান, জারি, মুর্শিদী, লালনগীতি, জালালগীতি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি গানের যেমন আসর জমায় তেমনি এ অনুষ্ঠানটির (১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যু বার্ষিকী) ১০/১৫ দিন আগ থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এখানে ওরা অবস্থান করে থাকে।

এখানেই ওরা রান্না বান্না করে নিজেরাই খাওয়া দাওয়া করে থাকে। ১৭ নভেম্বর বেশ কয়েকদিন পর এখান থেকে ওরা যার যার গন্তব্যে চলে যায়। জানা যায় মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশাতেও মহরম মাস, লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুল কদর ও মেরাজের উপলক্ষ সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইসলামিক দিনগুলোতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সুদুর আসাম থেকে মুরিদরা এখানে জমায়েত হতো এবং অনুষ্ঠানটি সমাপনান্তে চলে যেত। তাছাড়া জাতীয় সংকট মুহুর্তে দেশী, বিদেশী সাংবাদিকদের ডেকে মওলানা ভাসানী এই দরবার হলে প্রেসকনফারেন্স সহ রাজনৈতিক মিটিং করতেন।

মাজারের পাশেই মওলানা ভাসানীর জীবন, দর্শন ও রাজনীতির ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ সহ ভাসানী স্মৃতি সংসদ ও মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপন কমিটির পক্ষ হতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়ে থাকে। তাছাড়া মাজারের পূর্ব পাশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ও রাস্তার দুই পাশে মেলা বসে। মেলায় বিভিন্ন স্টলে বিভিন্ন ধরনের খেলনা এবং অস্থায়ী বইয়ের দোকানগুলোতে মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শন ও রাজনীতির উপর দেশী বিদেশী প্রথিতযশা লেখকদের অনেক ধরণের বইপুস্তক ও পান্ডুলিপি পাওয়া যায়।

এমনিভাবে সেখানে রয়েছে বাহারী দেশীয় পিঠা, টাঙ্গাইল অঞ্চলের পিঠা, মওলানা ভাসানীর তালের টুপি সহ টাঙ্গাইলের সন্তোষ এলাকার বিভিন্ন ধরণের বাঁশ, বেত, মুক্তারা ও মাঠির তৈরী বিভিন্ন জিনিষপত্র ও তৈজষপত্র। মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত শেষে রাস্তার পাশে পুকুড় পাড়ে পুত্র আবু নাসের খান ভাসানীর কবর ও কনিষ্ট পুত্র কিবরিয়া ভাসানীর কবর জেয়ারত শেষে মওলানা ভাসানীর সেই চিরাচয়িত এক সময়ের

ছনের ছাউনি ও চটের বেড়ার বাড়িটির দৃশ্য এখন কিছু বদলালেও তা দেখে বিকেল বেলার ওই দিন ফেরার আগে আবারো সহ যাত্রী সবাই মহান নেতা ও মুকুটহীন সম্রাট মওলানা ভাসানীর মাজার সংলগ্ন ঐতিহাসিক তালতলায় বেশ সময় গল্প গুজব, আলাপ আলোচনা করে গন্তব্যে রওয়ানা দেই।

তখন মানুষের ভীড় কিছুটা কম হলেও নাকি ভাসানী মেলা শেষ হতে নাকি আরো ৭দিন সময় লাগবে। একটা কথা বলা দরকার, তা হলো সামগ্রিক শান্তি শৃংখলা রক্ষা কল্পে পুলিশের সংখ্যাও কম ছিল না। ১৭ নভেম্বর যারা সন্তোষ আসতে পারেনি তাদের মধ্যে দেশী বিদেশী মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের ৭দিন পর্যন্ত নাকি আসা অব্যাহত থাকে।

 

মওলানা ভাসানী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ ও গণমানুসের দাবী নিয়ে ব্রিটিশদের কুইট ইন্ডিয়া (ভারত ছাড়) আন্দোলন, পাকিস্তানি একনায়কদের বিরুদ্ধে যেমন সংগ্রাম করেছেন, তেমনি তিনি ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলন থেকে পাকিস্তানীদের আসসালামু আলাইকুম সহ ৭০ এ চট্টগ্রামে প্রলয়ংকরী সামুদ্রীক জলোচ্ছাসে অসংখ্যা মানুষের প্রাণহানি, ঘরবাড়ী ধ্বংসস্তুপে পরিণত দূর্গতদের পাশে থেকে তিনি পুনরায় “পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য করে ওরা কেউ আসেনি বলে” আবার পাকিস্তানের একনায়ক সরকারকে আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে ছিলেন।

তাই মওলানা ভাসানী স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্রষ্টা হিসেবে দেশ, দুনিয়া ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে সমধিক পরিচিত। ১৯৭৪ সালে সরকার এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল ও স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট বা বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস করলে, তিনি এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছিলেন। অর্থাৎ যেখানেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ভুলন্ঠিত হয়েছে, সেখানেই তিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, সংগ্রাম করেছেন।

প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছেন, জেল জুলুম, হুলিয়া, বুলেট, ফাঁসির দড়ি তাকে ধমাতে পারেনি। জীবনে তিনি কখনও যেমন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি, তেমনি তিনি ছিলেন জনমানুষের আপোষহীন নেতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা ও মুকুটহীন অজেয় সম্রাট। একজন প্রখ্যাত সমসাময়িক দার্শনিক বলেছেন, মওলানা ভাসানীর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবন ব্যবস্থাই একটি দর্শন। পরিশেষে বলব, যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী, মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ।

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
লেখক কলামিষ্ট

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)