ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড

ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০, ২৬ আষাঢ়, ১৪২৭ , বর্ষাকাল, ১৮ জিলক্বদ, ১৪৪১

‘নতুন আইনের আওতায় সড়ক নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লাগবে’

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

নিরাপদনিউজ: জরিমানা ও সাজা কয়েক গুণ বাড়িয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে গতকাল শুক্রবার থেকে। তবে আইনটি সম্পর্কে খোদ প্রয়োগকারী সংস্থা ট্রাফিক পুলিশ, জনসাধারণ ও পরিবহন চালক-হেলপার বা পথচারীদের অধিকাংশই জানেন না। কোন অপরাধে কী শাস্তি-জরিমানা এ ব্যাপারে অধিকাংশই এখনো এক রকম অন্ধকারে।

সীমিত প্রচার ও পুলিশের প্রস্তুতির অভাবে প্রথম দিন আইনটির তেমন প্রয়োগ চোখে পড়েনি। উল্টোপথে গাড়ি ঢুকিয়ে দেওয়া; যত্রতত্র পার্কিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো; সিগন্যাল অমান্য; চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পারাপার সড়কে রোজকার এমন চিত্রের ব্যতিক্রম ঘটেনি নতুন আইন কার্যকরের প্রথম দিনেও।

সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টরা জানিয়েছেন, নতুন আইনের আওতায় সড়ক নিয়ন্ত্রণে আরও সময় লাগবে। কারণ কঠোর এ আইন সম্পর্কে এখনো অনেকেই অবগত নয়। ফলে কঠোর হওয়ার আগে সচেতনতা তৈরিতে রাস্তায় অনিয়মের জন্য দায়ী চালক-পথচারীদের কাউন্সেলিংয়ের দিকে জোর দিচ্ছেন; আইন সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন তারা। এর পর ধীরে ধীরে নতুন আইনটি প্রয়োগ করা হবে।

অবশ্য কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টদের কেউ কেউ বলেছেন, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর অভাবনীয় ফল পাচ্ছেন তারা। কারণ নতুন আইন কার্যকর হওয়ার ৪-৫ দিন আগেই সাধারণ মানুষ আইনটি সম্পর্কে গণমাধ্যম, ফেসবুকের মাধ্যমে কিছু ধারণা পেয়েছেন। পুলিশের কাছে এসেও বিস্তারিত জানতে চাচ্ছেন; নানা প্রশ্ন করেছেন। নতুন আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান অনেক বেশি হওয়ায় তা মানার ক্ষেত্রে মানুষ অনেক সতর্ক বলেই মনে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরনো আইনের সঙ্গে নতুন আইনে জরিমানায় বড় পার্থক্য থাকায় গতকাল খুব বেশি মামলা হয়নি। যে কয়েকটি হয়েছে তা স্লিপের মাধ্যমে হয়েছে।

গতকাল দিনভর রাজধানীর রামপুরা, হাতিরঝিল, বিজয়সরণি মোড়, ফার্মগেট, খামারবাড়ী মোড় ও পান্থপথসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট, পথচারী, পরিবহন-মোটরসাইকেলের চালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কার্যকর উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)র পক্ষ থেকে গতকাল বিকালে কাকরাইল মোড়ে আইনের উপর জনগণকে সচেতন করতে, জানতে ও মানতে উদ্বুদ্ধকরণ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। মানুষকে সচেতন করতে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন নিরাপদ সড়ক চাই -এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, এই আইনে এখন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সড়কে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই। বিশেষ করে আইনে জরিমানার বিধান রয়েছে শক্তভাবে। আমি সকল মহলকে অতীতে যেভাবে সড়ককে ব্যবহার করেছেন সেই পথ থেকে সরে আসার আহবান জানাই। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, দ্রুত গতি, বেপরোয়া এবং বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র দিয়ে রাস্তা পারাপার, আইন না মানা এই সংস্কৃতি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা শাস্তির আওতায় আসা অবধারিত। ইলিয়াস কাঞ্চন সড়কে চলাচলে সকলকে সচেতন হতে আহবান জানান।

গতকাল বিকাল ৫টার দিকে হাতিরঝিলের প্রবেশদ্বার এফডিসি-সংলগ্ন সিগন্যালে হাত উঁচিয়ে যানবাহন থামার সংকেত দেন কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ। গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলেও জেব্রা ক্রসিং পেরিয়ে সাত রাস্তার দিকে মোড় নেওয়ার চেষ্টা করেন মোটরসাইকেল চালক বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম। মুহূর্তেই তাকে থামিয়ে ঘিরে ধরেন কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট ফজলে রাব্বিসহ ৩ ট্রাফিক পুলিশ। নিয়ম অনুযায়ী ওই মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে সিগন্যাল অমান্যের ধারায় মামলা দেওয়ার কথা থাকলেও গতকালের চিত্র ছিল ভিন্ন। ওই চালককে নতুন আইনে বিশাল জরিমানা ও দ-ের বিষয়ে বোঝাতে দেখা যায় সার্জেন্টকে। পরে ভুল স্বীকার করে স্যরি বলে সাইফুল ইসলাম ফিরে যান পেছনে।

এ বিষয়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট ফজলে রাব্বি বলেন, এক দিনেই সব হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন নয়। কারণ নতুন আইনের জেল-জরিমানার বিষয়ে এখনো অনেকেই জানেন না। তাই কঠোর হওয়ার আগে এই আইনের বিষয়ে প্রথম দিন আমরা চালক-পথচারীদের কাউন্সেলিং করছি; আইন সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছি। তা ছাড়া নতুন আইন প্রয়োগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা আসেনি। ফলে পরবর্তী নির্দেশনা আসার আগ পর্যন্ত আমরা কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টিতে জোর দেব। পর্যায়ক্রমে সহনীয় মাত্রায় আইনটি প্রয়োগ করা হবে। বাস্তবায়ন শুরু হলে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। জনগণও আইনটি মানতে বাধ্য হবে।

বিকাল ৪টার দিকে হাতিরঝিলের ব্যস্ত সড়কের পাশে ৪টি মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে বেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জুনায়েদ সিদ্দিকি ও ফিরোজসহ ৪ বন্ধু। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে অবগত কিনা জানতে চাইলে ফিরোজ বলেন, ফেসবুকের মাধ্যমে নতুন আইন সম্পর্কে কিছুটা জানি। তবে কোন বিষয়ে কত জরিমানা তা জানি না। অবৈধ পার্কিংয়ে ৩ মাসের জেল ও সর্বোচ্চ ১০ হাজার জরিমানা হবে এতটুকু বলার পর আর তেমন কিছু জানাতে পারেননি তিনি। তবে নতুন আইন কঠোর হলেও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান তিনি।

জুনায়েদ বলেন, এত বড় হাতিরঝিল, কিন্তু গাড়ি-মোটরসাইকেল পার্ক করার জায়গা কোথায়? আমরা যারা ঘুরতে আসি গাড়ি রাখব কোথায়? সরকারকে আগে নগরের অবকাঠামো ঠিক করতে হবে। তার পর আইন না মানলে প্রয়োগ করতে বলেন। তিনি আরও বলেন, আইন আগে যা ছিল তা-ও কম নয়। কিন্তু প্রয়োগ হতো মুখ দেখে দেখে। শুধু আইন হলেই হবে না, তার প্রয়োগও হতে হবে সমভাবে। তবেই সড়কে ফিরবে শৃঙ্খলা।

বিজয়সরণিতে কর্মরত ট্রাফিক সার্জেন্ট অথেলো রানা বলেন, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই গণমাধ্যম ও ফেসবুকের কল্যাণে অনেকেই এ সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ বৃহস্পতিবারের তুলনায় আজকের (শুক্রবার) সড়কের চিত্র ভিন্ন। যে কটি গাড়ি ও মোটরসাইকেল চেক করা হয়েছে, সেগুলোর কেউ লাইসেন্স বা হেলমেট ছাড়া রাস্তায় বের হননি; অনিয়মও পাওয়া যায়নি। শাস্তির বিধান বেশি থাকায় সবাই হয়তো চেষ্টা করছেন আইনটি মেনে চলার। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করতে হলে দুটি বিষয় জরুরি নতুন আইন কার্যকর করা এবং পুরনো আইন বন্ধ করে দেওয়া। কাজটি অত্যন্ত জটিল হলেও কাজ শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে পুরনো আইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন আইন নিয়ে ব্যাপক গবেষণার পর আইনটি কোন কৌশলে প্রয়োগ করলে জনগণ, পুলিশ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকের জন্য সুবিধা হবে সেটাও বের করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন আইন বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x