ব্রেকিং নিউজ

আপডেট নভেম্বর ৩, ২০১৯

ঢাকা শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ৫ শাওয়াল, ১৪৪১

ঘাটাইলের ঐতিহ্যবাহী সাগরদীঘি

লিটন এরশাদ

রাজা সিরাজ, নিরাপদ নিউজ: বুকে গভীর জল নিয়ে পাল রাজ বংশের শাসনামলে খনন করা দীঘি কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সাগরদীঘি। সভ্যতার নির্ভিক সাক্ষী দীঘিটির অবস্থান উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কি:মি: পূর্ব দিকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এলাকাটির পূর্ব নাম ছিল লোহানী। কীর্তিমান পুরুষ সাগর রাজা দীঘি খনন করার পর তার নামের সাথে দীঘি যোগ করে এলকার নামকরণ করা হয় সাগরদীঘি। সেই থেকে পাহাড়ী জনপদটি সাগরদীঘি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পাড়সহ দীঘির মোট আয়তন ৩৬ একর। দীঘির পাড় বেশ চওড়া হওয়ায় একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু স্থাপনা। উত্তর পাড়ে রয়েছে সাগরদীঘি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ পাড়ে সাগরদীঘি দাখিল মাদ্রাসা। পশ্চিম পাড়ে রয়েছে অস্থায়ী এলজিইডি বাংলো এবং পূর্বপাড়ে সাগরদীঘি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র।
এক সময় দীঘির যৌবনের আলোক ছটায় মুগ্ধ হতো শত শত প্রকৃতি প্রেমী দর্শনার্থী। সবুজের সমারোহে ভরপুর ছিল দীঘির পাড়। আর সবুজ পত্রপল্লবের নান্দনিক পরিবেশ বিষন্ন মনেও দোলা দিয়ে যেত চোখের পলকে। স্বচ্ছ পানির ঢেউ আঁচড়ে পড়ত পাড়ে। গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ রোদ্দুরে অচেনা পথিকের স্নান ও তৃষ্ণা দুই-ই মেটাতো এর জল।
জনশ্রুতি আছে, বহুকাল আগে পাল রাজাদের শাসনামলে এ অঞ্চল ছিল ঘন বন আর জঙ্গলে ভরা। পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় বন্যপ্রাণী আর জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য হিসাবেও পরিচিত ছিল অঞ্চলটি। এরই মাঝে গড়ে উঠে মানুষের বসবাস। তবে এখানে পানির সংকট ছিল তীব্র। সাগর রাজা তার প্রজাদের সুপেয় পানির জন্য একটি দীঘি খননের সিদ্ধান্ত নেন। সেই অনুসারে ৩৬ একর জমির উপর দীঘি খননের কাজ শুরু করেন। দীঘিটি খননে সময় লাগে প্রায় দুই বছর। আর এতে খনন কাজে অংশ নেয় দুই হাজার শ্রমিক।
দীঘিকে ঘিরে রূপকথা আর গল্পকাহিনী থেকে জানা যায়, পর্যাপ্ত গভীরতা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে দীঘির তলানীতে পানি না উঠায় রাজা চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কোন এক রাতে রাজা স্বপ্নে আদিষ্ট হন যদি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে দীঘিতে নামানো হয় তাহলে দীঘিতে পানি উঠবে। রাজা ঘুম থেকে জেগে সকালে রানীকে সব খুলে বললেন। সব শুনে রানীও প্রজাদের সুখের কথা চিন্তা করে দীঘিতে নামার প্রয়াস ব্যক্ত করেন। দিনক্ষণ ঠিক করা হলো। রাজার বিস্ময়কর এমন সিদ্ধান্তের বাস্তব দৃশ্য নিজ চোখে দেখার জন্য নির্দিষ্ট দিনে কৌতুহলী জনতা দীঘির চারপাশে ভিড় জমায়। শুকনো দীঘিতে রানী নামলেন। কিছুদূর যেতেই দীঘির তলদেশ থেকে পানি উঠতে শুরু করে। দেখতে দেখতে রানীর সমস্ত শরীর ডুবে যেতে লাগলো। দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজারা হই-হুল্লুর শুরু করে দিল। রানীকে উদ্ধারে চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা রাজার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাঁচানো গেলনা রানীকে। প্রজাদের সুখের জন্য রানীর আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেল সাগর রাজার দীঘি। পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হলো দীঘি। সাগর রাজার নামেই দীঘিটির নামকরণ হলো সাগরদীঘি। এ অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বি লোকদের বিশ্বাস এখনো রানীর আত্মা রাতের আধারে ঘুরে বেড়ায় দীঘির পাড়ে। তাই তারা রানীর আত্মাকে শান্ত রাখতে বিভিন্ন সময় পূজা অর্চনা করে থাকে।
সাগর রাজা এ অঞ্চলে রেখে যাননি কোন রাজ প্রাসাদ। তবে তার স্মৃতিবিজড়িত দীঘিটি আজ কালের গর্ভে অনেকটাই মলিন হতে চলেছে।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of