ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯

ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০, ২৬ আষাঢ়, ১৪২৭ , বর্ষাকাল, ১৮ জিলক্বদ, ১৪৪১

সড়ক দুর্ঘটনায় দুই মেয়েসহ ব্যাংক কর্মকর্তার মৃত্যুতে মুহূর্তেই তছনছ সাজানো সংসার

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ: ছেলেমেয়ের পরীক্ষা শেষ। তাই কয়েকদিনের ছুটিতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন বান্দরবান। প্রকৃতির রূপ দেখে-দেখে সেখানেই কাটান কয়েকদিন। বেড়ানো শেষে ঘরে ফেরার পালা। নিজের প্রাইভেট কারে চড়ে শনিবার ঢাকায় ফিরছিলেন। সাথে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে। কিন্তু ঘরে আর ফেরা হয়নি সাইফুজ্জামান খান মিন্টুর। তিনি যুগ্ম পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার মিরপুরে তাঁর বাসা। শুধু মিন্টু একা নন, ঘরে ফিরতে পারেনি তার দুই মেয়েও। ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনই (বাবা ও দুই মেয়ে) ফিরেছেন লাশ হয়ে। গুরুতর আহত স্ত্রী-ছেলেও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের শয্যায়। একটি সাজানো সুখের সংসার যেন নিমিষেই তছনছ। বেড়ানোর আনন্দ শেষ না হতেই বিষাদের কালো মেঘ যেন গ্রাস করেছে পুরো পরিবারকে।

গতকাল ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড থানাধীন ফৌজদারহাট বাইপাস মোড়ে মিন্টুর ঢাকামুখী প্রাইভেট কারটির সাথে চট্টগ্রামমুখী কনটেইনারবাহী একটি লরির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রাইভেট কারে ছিলেন সাইফুজ্জামান খান মিন্টু (৪৫), স্ত্রী কণিকা জামান খান (৩৯), বড় মেয়ে আশরা জামান খান (১৩), মেঝ মেয়ে তাসনিম জামান খান (১১) ও ছেলে মন্টি খান (১০)। বড় মেয়ে আশরা জামান খান ফেনী ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এবার সপ্তম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছে। গতবছর সেখানে ভর্তির সুযোগ পায় সে। আর মেঝ মেয়ে ও ছোট ছেলে ঢাকার একটি স্কুলের চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী।

এ ঘটনায় মিন্টুর দুই মেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের টিম গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দুই মেয়ের লাশ উদ্ধার করেন। আর গুরুতর আহত তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে মৃত্যু হয় মিন্টুর। স্ত্রী কনিকা এবং ছেলে মন্টিও আশঙ্কামুক্ত নয়। নিউরোসার্জারী ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মিন্টুর স্ত্রী কণিকার ক্ষণিক জ্ঞান ফিরছিল, আবার অচেতন হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছিলেন শুধু। ছেলে মন্টির তখনো জ্ঞান ফেরেনি। আহত দুজনকেই শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীল ব্রত বড়ুয়া।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জহিরুল হক জানান, সীতাকুণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সাইফুজ্জামানসহ তার স্ত্রী ও ছেলেকে হাসপাতালে আনার পর বেলা ১১টার দিকে সাইফুজ্জামানের মৃত্যু হয়। তার মাথায় মারাত্মক আঘাত লেগেছে। স্ত্রী এবং ছেলের অবস্থাও আশংকাজনক। তাদের হাসপাতালের ২৮নম্বর ওয়ার্ডে নিউরোসার্জারি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট খায়রুল ইসলাম বলেন, সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা একটি লরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ফৌজদারহাট-বন্দর সংযোগ সড়কের দিকে ঘুরছিল। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা দুটি প্রাইভেটকারের সঙ্গে লরির সংঘর্ষ হয়। এতে একটি প্রাইভেটকারে থাকা দুই বোন ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি মো. আবদুল আওয়াল বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান মন্টু পরিবার নিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাবার সময় ফৌজদারহাট বাংলাবাজার এলাকায় বিপরীতমুখী একটি লরি তাদের গাড়িকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলে তার দুই মেয়ে ও হাসপাতালে নেবার পর মন্টুও নিহত হন। ড্রাইভারসহ লরিটি আটক করা হয়েছে। কার দুইটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অপর কারের ড্রাইভার সুস্থ আছেন।

মিন্টুর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মিন্টুর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মৃত আব্দুর রহমান। পরিবারে পাঁচ ভাই-ছয় বোনের মধ্যে মিন্টু দশম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে যোগ দিয়েছিলেন সাইফুজ্জামান। পরে যুগ্ন-পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান।

সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শনিবার দুপুরে হাসপাতালে ছুটে আসেন সাইফুজ্জামানের তিন ভাই কুমিল্লার সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জেড আই মিজানুর রহমান খান,বিজিবির একটি ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক কর্নেল জেড আই নজরুল ইসলাম খান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেড আই মনিরুজ্জামান খান। এসময় সেখানে ছিলেন মিন্টুর ভাই নজরুলের বন্ধু ও একই এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন। তিনি নগরীর নাসিরাবাদ সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এছাড়াও নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) বিজয় কুমার বসাকসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরাও ছুটে আসেন হাসপাতালে।

আকস্মিক স্বজন হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে উঠছিল হাসপাতালের আকাশ-বাতাস। ছিল ঘন মেঘের ঘন-ঘটাও। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী-শুভার্থীর বোবা আর্তনাদ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়াই কেবল বাকি ছিল।

ঘটনার আকষ্মিকতায় নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোজাম্মেল হোসেনও ছিলেন নির্বাক। বাকরুদ্ধ কন্ঠে তিনি জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর মিন্টুর বড় মেয়ের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়। ওইদিন দুপুরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন মিন্টু। ফেনী ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজের গেইট থেকে বড় মেয়েকে তুলে নেন গাড়িতে।

ঢাকায় থাকতে আমার বাসায় উঠার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, বাসায় উঠবেন এবং রাতে ভাত খেয়ে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দেবেন। তবে ফেনী আসার পর ফোনে সরাসরি বান্দরবান চলে যাওয়ার কথা জানান। মোজাম্মেল জানান, চট্টগ্রামে পৌঁছে নিজের প্রাইভেট কারটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসে পার্কিং করে জিপ নিয়ে বান্দরবান চলে যান। সেখানে বান্দরবানের বেশকিছু স্পট ঘুরে থানচিও চলে যান বেড়াতে। বেড়ানো শেষে শনিবার ভোরে বান্দরবান থেকে ফিরে প্রাইভেট কারটি চালিয়ে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছিল। কিন্তু বাসায় আর ফিরতে পারলো না। পথে সব শেষ হয়ে গেল। একটি সাজানো-গোছানো সংসার নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো।
তিনজনের লাশ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানিয়ে গত রাতে মোজাম্মেল হোসনে জানান, রোববার সকালে জানাজা শেষে লাশের দাফন করা হবে। আর স্ত্রী কনিকা ও ছেলে মন্টুকে শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের সিএমএইচ-এ স্থানান্তর করা হয়েছে। তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x