ব্রেকিং নিউজ

আপডেট জানুয়ারি ১৪, ২০২০

ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০, ২৮ আষাঢ়, ১৪২৭ , বর্ষাকাল, ২০ জিলক্বদ, ১৪৪১

ট্রেনে পাথর ছোঁড়া বন্ধ হবে কবে?

লিটন এরশাদ

রেজানুর রহমান, নিরাপদ নিউজ: এবারের মতো চোখ দুটো বেঁচে গেল। মহান সৃষ্টিকর্তার অপার রহমতে মারাত্মক এক দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি। এই যে লেখাটি লিখছি সেটা হয়তো সম্ভব হতো না। আমার পরম সৌভাগ্য যে, মহান সৃষ্টিকর্তা আমাকে চরম এক বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তা নাহলে এখন হয়তো আমাকে শহরের কোনো চক্ষু হাসপাতালে থাকতে হতো। চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে লড়াই করতে হতো। অনেক কৃতজ্ঞতা মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি।
বহুবার ভেবেছি ঘটনাটি যেহেতু একান্তই ব্যক্তিগত। কাজেই এটি ফেসবুকে উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে কী? পরক্ষনেই মনে হয়েছে ঘটনাটি ব্যক্তিগত হলেও ভবিষ্যতে আর কারও জীবনে যাতে না ঘটে সেজন্য জনসমক্ষে তুলে ধরা দরকার।
শুরুটা কীভাবে করবো তাই ভাবছি? তিন কিশোরের হাসিভরা মুখ চোখের সামনে ভাসছে। নিস্পাপ চেহারা। দেখে মনে হচ্ছিল ফুলের মতো পবিত্র। রেল লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনজনই হাসছে। ভদ্র চেহারা। ভদ্র পোশাক। পবিত্র হাসি। চলন্ত ট্রেনের কামরায় জানালার পাশে বসে ওদেরকে অপলক দেখছি। হঠাৎ ভদ্রতার মুখোশ বদলে গেল। তিন কিশোরই অশুরের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে হাসতে হাসতে হাতের কাছে লুকিয়ে রাখা বিরাট পাথরের ঢিল ছুঁড়লো ট্রেনে আমার জানালা লক্ষ্য করে। আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। চোখ খুলতে সাহস পাচ্ছি না। চিলহাটি থেকে ছেড়ে আসা নীলসাগর এক্সপ্রেস চলছে প্রচন্ড গতিতে। আমি যাচ্ছি এসি বাথে। ট্রেন প্রায় ৪ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকার দিকে ছুটছে। জয়দেবপুর থেকে টঙ্গীর মাঝামাঝি এলাকায় ঘটলো এই ঘটনা। ট্রেনের কাচের জানলায় টিল পরায় আমার সহযাত্রীরা উৎকণ্ঠিত। ঐযে বললাম সৃষ্টিকর্তার অপার রহমতে আমার চোখে আঘাত লাগেনি। জানালার কাচে স্ক্র্যাচ পড়েছে। সহযাত্রী বন্ধুরা ক্ষুব্দতা ছড়াতে শুরু করলেন, চলন্ত ট্রেনে অহরহ এ ধরনের ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোটো ছোটো বাচ্চারাই খেলাচ্ছলে এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। কখনও কখনও নিরীহ যাত্রীরা শারিরীক ভাবে আঘাত প্রাপ্ত হচ্ছেন। এর থেকে পরিত্রানের উপায় কী? একজন যাত্রী আমাকে নিয়ে দারুন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, ভাই আপনার কোনো ক্ষতি হয়নি তো? ভয় পেয়েছেন না? ভয় পাবারই কথা। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তা নাহলে জানালার কাঁচ যদি ভেঙ্গে যেত তাহলে চোখ দুটো বাঁচাতে পারতেন না। হয়তো অন্ধ হয়েই সারাটা জীবন বয়ে বেড়াতে হোত।
ট্রেন চলছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সত্যি তো জানালার কাঁচ ভাঙ্গলেই আমার দুই চোখ হয়তো অন্ধ হয়ে যেতো। তিন কিশোরের খামখেয়ালীপনায় হয়তো আমার জীবনের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত! এজন্য দায় কার? ওই তিন কিশোরের? কী নিস্পাপ চেহারা! ট্রেনের জানলার ধারে বসে মুগ্ধ হয়ে ওদেরকে দেখছিলাম। এরাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। ঘটনা ঘটার আগে ওদের প্রতি আমার শুভাশীষ ছিল এরকম- বেঁচে থাকো বাবারা…
কিন্তু ওরা কেন অশুরের ভূমিকা নিল? ওদের ভদ্র পোশাক ও ভদ্র চেহারা দেখে মনে হচ্ছে স্কুলে পড়ে। স্কুল ওদেরকে কী শেখাচ্ছে? ওদের পরিবারের ভূমিকাই বা কী? কোনটা ভালো কোনটা মন্দ! এই বয়সের বাচ্চাদের তো এটা জানার কথা! তাদেরকে এ বিষয়ে ভালো-মন্দ শেখানোর দায়িত্ব তো পরিবারের। পাশাপাশি স্কুলেরও! তাহলে কী ছেলে মেয়েদেরকে ভালো-মন্দ শেখাতে পরিবারের পাশাপাশি স্কুলও ব্যর্থ হচ্ছে? এ বিষয়ে বিতর্ক হওয়া জরুরি।
আবারও মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। পাশাপাশি ফুলের মতো নিস্পাপ চেহারার ওই তিন কিশোরের বোধ-বুদ্ধির মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গি কামনা করি। শেষে অভিভাবকদের প্রতি আমার একটি আরজি তুলে ধরতে চাই।
জানেন কী প্রতিদিন আপনার প্রিয় সন্তান কোথায় যায়? কী করে? কার সাথে মিশে? আপনার প্রিয় সন্তানের বন্ধু কারা সেকথা জানেন কী? প্লিজ খোঁজ নিন। তা নাহলে ওরাও হয়তো ট্রেনে পাথর ছোড়া তিন কিশোরের মতো অশুর হয়ে উঠবে। আমি নিশ্চিত, ট্রেনের জানালা লক্ষ্য করে যে কিশোরেরা ঢিল ছুঁড়েছিল তাদের বাবা-মায়েরা সন্তানের ভালো-মন্দ খোঁজ রাখেন না। রাখলে তারা এ ধরনের ভয়ংকর খেলায় লিপ্ত হতো না।
কাজেই প্রতিদিন সন্তানের ভালো-মন্দ খোঁজ নিন। প্লিজ…
চলন্ত ট্রেনে মাঝে মাঝেই এই যে পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটছে তা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। রেল কর্তৃপক্ষকেই এই আন্দোলনের ডাক দিতে হবে। এলাকার জনপ্রতিনিধি, বিশেষ করে স্কুল কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম সহ পরিবারের ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ।
দেশকে ভালোবেসে ভালো থাকুন সকলে। সবার জন্য রইলো শুভ কামনা।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x