ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ১৭ মিনিট ৭ সেকেন্ড

ঢাকা শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০, ২৪ শ্রাবণ, ১৪২৭, বর্ষাকাল, ১৭ জিলহজ, ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

ট্রলার ডুবি: রোহিঙ্গা তরুণীর প্রেমের সলিলসমাধি!

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

নিরাপদ নিউজ: সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার ডুবির ঘটনায় ১৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। ৭৩ জনকে জীবিত উদ্ধার সম্ভব হলেও আরো ৫০ জন রোহিঙ্গা এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। দুর্ঘটনার তিন দিনেও নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া যাওয়াতে তাদের জীবিত থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছে স্বজনরা।

বিজ্ঞাপন

সাগরে দুর্ঘটনার শিকার রোহিঙ্গাদের ট্রলারটিতে বেশিরভাগ ছিল রোহিঙ্গা তরুণী। যাদের মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবকদের সাথে বিয়ে দিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অনেকের বিয়ে ঠিক হয়েছে সেখানকার রোহিঙ্গা যুবকদের সঙ্গে। ট্রলারে চেপে যাচ্ছেন হবু স্বামীর সঙ্গে অপেক্ষার অবসান ঘটাতে। কিন্তু সেদিনের দুর্ঘটনা কয়েকটি হবু দম্পতির সম্পর্কে চির যবনিকাপাত ঘটিয়েছে।

গত মঙ্গলবার ভোররাতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে যে ট্রলারটি ডুবে গিয়েছিল সেই ট্রলারে ছিলেন ছেনোয়ারা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা তরুণী। উখিয়ার থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা তিনি। মিয়ানমারের মংডু বলিবাজারে তাদের বাড়ি। গত ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আসে তার পরিবার। মিয়ানমারে নিজ গ্রামের মক্তবে পড়াকালীন সময়ে একই এলাকার সাদ্দাম হোসেন নামে এক ছেলের নজরে পড়ে সুন্দরী ছেনোয়ারা। প্রথম পর্যায়ে ভাললাগা থেকে দুইজনে এক সময়ে প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হন। তখন ছেনোয়ার বয়স ছিল দশ বছর। দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে উভয় পরিবারের তাদের দুইজনের মধ্যে বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়।

২০১৫ সালে সাদ্দাম মালয়েশিয়াতে চলে যায় কাজের সন্ধানে রোজগারের আশায়। পরে এসে ছেনোয়ারাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে করে তুলার কথা ছিল। পরে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিপীড়নের সময় ছেনোয়ারার পরিবার বাংলাদেশে চলে আসার পরও তাদের পূর্বের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। গত জানুয়ারি মাসে উভয় পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার। প্রথমে সাদ্দামের মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে আসার সিদ্ধান্ত থাকলেও পরে সিদ্ধান্ত হয় ছেনোয়ারাকে মালয়েশিয়াতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য। কথাগুলো বলছিলেন, সাদ্দামের বড় বোন রুবিনা আকতার।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাসপোর্ট করে আসা যায় কিনা সেই চেষ্টাও করেছিল দুই পরিবার। কিন্তু কড়াকড়ির কারণে পাসপোর্ট করে বিমানে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়া কোনোভাবে সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, সাগর পথে ট্রলারে চেপে ছেনোয়ারাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার। হবু স্বামী সাদ্দাম দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব কাজ ঠিকঠাক করেছিল। ৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ছেনোয়ারা ক্যাম্পের ঘর থেকে মা বাবার কাছে শেষ বিদায় নিয়ে দালালের সাথে চলে যায় । সাথে ক্যাম্প থেকে মালয়েশিয়াগামী অন্য রোহিঙ্গারাও ছিল। তারা তিন দিন দালালের আস্তানায় অবস্থান করেছিল। সেখানে প্রতিদিন মোবাইলে সাদ্দামের সাথে কথা তার।

সবশেষ গত সোমবার সন্ধ্যায় মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে যখন ছেনোয়ার ডাক পড়েছিল, তখন তিনি দালাল কাছ থেকে মোবাইল চেয়ে নিয়ে শেষবার হবু স্বামীর কাছে দোয়া চেয়ে নিয়েছিলেন। হবু স্বামী সাদ্দামের উৎকণ্ঠায় ছেনোয়ারা তাকে চিন্তা করো না বলে ভরসা দিয়ে ফোন কেটে দেন। তারপর ছেনোয়ার ট্রলারে ওঠে যান।

এদিকে ট্রলার ডুবির খবর পাওয়ার সাথে সাথে মালয়েশিয়াতে অবস্থানরত সাদ্দাম হোসেন প্রায় পাগল হয়ে যান। কখনো বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে, কখনো ফেসবুকে উদ্ধার হওয়া নারীদের মধ্যে তার সাত বছরের প্রেমের প্রিয়তমা খুঁজছিলেন। সেন্ট মার্টিনসের স্থানীয় বাসিন্দাদের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমে দিনবর খবর নিয়েছেন জীবিতদের মধ্যে ছেনোয়ারা বেগম, থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঠিকানায় কেউ আছে কি না। শেষ পর্যন্ত সারাদিন চেষ্টা করেও জীবিত উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ছেনোয়ারার হদিস মেলেনি। মৃতদের মধ্যেও তার সঠিক সন্ধান পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার ক্যাম্পে তার পরিবারে লাশ পৌঁছলে তখন তারা নিশ্চিত হন ছেনোয়ারা আর বেঁচে নেই।

সাদ্দামের বোন রুবিনা জানায়, ট্রলার ডুবির পরও ভাইয়ের আশা ছিল ছেনোয়ারা বেঁচে আছে। কিন্ত আজ বৃহস্পতিবার ছেনোয়ারার লাশ বুঝে পেয়ে পরিবার থেকে ভাইয়ের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করে। খবরটি শুনার পর থেকে আমার ভাই (সাদ্দাম) জ্ঞান হারিয়ে পেলে। আমার ভাই মেয়েটিকে ছোটবেলা থেকে পছন্দ করতো এবং একসময় তাদের দুই জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হয়। তবে তাদের সম্পর্কে কুরুচির কিছু ছিল না, ভালোলাগা থেকে দুইজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধের প্রহর গুনছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের বন্ধনের সেই প্রহর শেষপর্যন্ত সাগরে শেষ হয়ে গেল।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x