ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ৯ মিনিট ৩ সেকেন্ড

ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ৬ শাওয়াল, ১৪৪১

জানেন পঙ্গপাল কী, কীভাবে এরা জড়ো হয়?

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

নিরাপদ নিউজ: গত বছরের শেষ দিকে আফ্রিকার ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও সোমালিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে পঙ্গপাল আক্রমণ করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। আফ্রিকার পরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানে আক্রমণ করেও ফসলের ক্ষতি করেছে বিশেষ ধরনের এই পতঙ্গ। সর্বশেষ ভারতের পাঞ্জাবেও তারা হানা দিয়েছে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, আগামী বছর নাগাদ বাংলাদেশেও চলে আসতে পারে  বিশাল এই পতঙ্গের ঝাঁক।

এরা মূলত ছোট শিংবিশিষ্ট এক প্রকার পতঙ্গ, সাধারণভাবে আমরা যাকে ঘাসফড়িং বলি। স্বভাবে কিছুটা লাজুক প্রকৃতির এই পতঙ্গ দৈর্ঘ্যে সাধারণত ১ ইঞ্চি হয়। ঘাসফড়িংগুলো যখন দলবেঁধে চলাফেরা করে তখন এদের ‘পঙ্গপাল’ বলে। জীবনকালের কিছু সময় এরা অন্যান্য পতঙ্গের মতই আলাদা থাকে। কিন্তু কোনো এক সময় এরা দলবেঁধে খাদ্য সংগ্রহে বের হয়। পঙ্গপালের জীবনচক্রের এই সময়টিকে গ্রেগোরিয়াস ফেজ বা দলবদ্ধ পর্যায় বলা হয়।

পঙ্গপাল এবং ঘাসফড়িং-এর মধ্যে শ্রেণীগত পার্থক্য নেই। এরা অ্যাক্রিডিডি পরিবারভুক্ত পতঙ্গ। বৈজ্ঞানিক নাম লোকাস্টা মাইগ্রেটিয়া। ঘাসফড়িং থেকে পঙ্গপালকে আলাদা করা হয় এদের সঙ্গবদ্ধ হওয়ার কারণে। দল বাঁধার আগের পর্যায়ে এদেরকে ফড়িং বলা হয়। নির্দিষ্ট পরিবেশগত কারণে এরা আচরণের পরিবর্তন ঘটায় এবং সংঘবদ্ধভাবে থাকতে শুরু করে। পঙ্গপালের একেক ঝাঁকে কয়েক লাখ থেকে এক হাজার কোটি পতঙ্গ থাকতে পারে।

সাধারণত দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির পর যখন বৃষ্টিপাত হয় এবং দ্রুত ফসল বৃদ্ধি পায় তখনই এদের মস্তিষ্কের সেরোটনিন আচরণগত পরিবর্তন ঘটায় এবং তারা দ্রæত বংশবৃদ্ধি করে। পেছনের পায়ে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে মস্তিষ্কে সেরোটনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় তাদের রং পরিবর্তন হয়, খাদ্য গ্রহণের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা দলবদ্ধ হয়ে যায়। প্রথমে ছোট ছোট দল গঠিত হয় এবং এক দল আরেক দলের সাথে যুক্ত হয়। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন দলের সমন্বয়ে বিরাট পঙ্গপাল গঠিত হয়। পঙ্গপাল তখন যাযাবরের ন্যায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে এবং জমির ফসলে আক্রমণ করে। শুরুতে তারা বিরাট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে আরো বেশি সংঘবদ্ধ হয়ে তারা অল্প জায়গার মধ্যে চলে আসে। তারা সাধারণত চোখে দেখে অন্য দলের প্রতি আকর্ষিত হয়। তবে ঘ্রাণ এবং সূর্যরশ্মির মাধ্যমেও তারা অন্য দল খুঁজে নেয়।

সাধারণ ঘাসফড়িং থেকে পঙ্গপালে রূপান্তরিত হওয়ার সময় এদের শরীর সবুজাভ বর্ণ থেকে কিছুটা হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং তার মধ্যে কালো দাগ দেখা যায়। এসময় দ্রুত শারীরিক বর্ধন ঘটে এবং তারা সাধারণ ফড়িংয়ের তুলনায় আকারে বড় হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শেফালী বেগম বলেন, ‘শরীরের হরমোনের পরিবর্তনের ফলে এদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বর্ধিত পতঙ্গের খাবারের জন্য তারা দলবেঁধে খাদ্য সংগ্রহ করতে বের হয়। পঙ্গপাল যে স্থান অতিক্রম করে সেখানকার ফসল, উদ্ভিদ এবং ঘাসজাতীয় সবুজ যা কিছু পায় তাই তারা শেষ করে ফেলে।’

বিরাট পঙ্গপালের সামনের দিকে থাকা কোনো পতঙ্গ যখন কোনো ফসলের উপর বসে, তখন বাকিরাও সেখানে যাত্রা বিরতি দিয়ে খাদ্য গ্রহণ শুরু করে। এভাবে তারা দীর্ঘসময় খাদ্য গ্রহণ এবং বিশ্রামে অতিবাহিত করে। এরপর তারা আবার কিছুদূর উড়ে যায় এবং সেখানকার ফসল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে। এভাবে বছরের পর বছর পঙ্গপাল ফসলের জমির উপর আক্রমণ অব্যাহত রাখতে পারে।

অ্যান্টার্কটিকা এবং উত্তর আমেরিকা ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন পঙ্গপাল রয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান প্লেগ পঙ্গপাল এবং উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া অঞ্চলের মরু পঙ্গপাল সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তবে মরু পঙ্গপাল বিচরণ ক্ষমতার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। একটি মরু পঙ্গপালের আকার ৪৬০ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিভিন্ন দেয়ালচিত্র থেকে পঙ্গপাল আক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সময় থেকেই এদের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। আক্রমণ ঠেকাতে মানুষ নানা পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো খুব ভালো কাজে দেয়নি। তবে পঙ্গপালের বিস্তার রোধে এগুলো দলবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই প্রতিরোধ করে ভালো ফল পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও পঙ্গপালের আক্রমণ রোধে বিমান থেকে কীটনাশক স্প্রে করারও নজির রয়েছে। ড. শেফালী বেগম বলেন, ‘এরা যেহেতু বিস্তৃত এলাকাজুড়ে থাকে এবং উড়ে বেড়ায় তাই কীটনাশক দিয়ে এদের ধ্বংস করা সম্ভব হয় না।’

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of