ব্রেকিং নিউজ

আপডেট এপ্রিল ১৭, ২০২০

ঢাকা মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ৮ শাওয়াল, ১৪৪১

করোনায় চিকিৎসকের মৃত্যু: ঢাল-তলোয়ার ছাড়া অসম যুদ্ধ

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

নিরাপদ নিউজ: পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীন। যিনি এ ভাইরাসে মারা যাওয়া প্রথম চিকিৎসক এবং সিলেটে করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। ডা. মঈন উদ্দীনের মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি দুঃখজনক ঘটনা।

তবে শোক প্রকাশ করে দায়মুক্তির অবকাশ এখানে নেই। একজন চিকিৎসকের নিজের হাসপাতালেই চিকিৎসা না পাওয়া এবং অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার মতো অবহেলাজনিত ঘটনা বর্তমান পরিস্থিতি এবং সঙ্কটের চিত্রটিই তুলে ধরে। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হওয়ার চেয়ে মৃতের সংখ্যা বেশি। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার হাল যদি এমন হয় যে, চিকিৎসকই করোনা আক্রান্ত হয়ে হয়ে শুশ্রুষার অভাবে মারা যাচ্ছেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে?

ইতোমধ্যে করোনার হটস্পট ও ক্লাস্টার জোন হিসেবে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ও উপ-পরিচালকসহ ১৭ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া নারায়াগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ও জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও করোনা প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধিসহ বেশ কয়েকজন ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয় ও অ্যাম্বুলেন্স চালক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আগের থেকেই আইসোলেশনে রয়েছেন। তাদের সংস্পর্শে এসে আরো ডজন খানেক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন কোয়ারেন্টাইনে। এছাড়া সারাদেশে আরও বহু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে।

কিছুদিন আগে দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে সাধারণ জ¦র বা সর্দি কাশি নিয়ে রোগী গেলে তাদের চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। জ¦র-সর্দি-কাশি-শ^াসকষ্ট করোনা আক্রান্তের লক্ষণ হওয়ায় চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এরকম রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছিল না। তবে যারা সাধারণ রোগী অর্থ জ¦র-সর্দির বাইরে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত তাদেরও চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমে খবর বেরোয়, অনেক রোগী এ হাসপাতাল-সে হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন। সাধারণ রোগীর হাসপতালে গিয়ে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে মৃত্যুর এসব ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

বস্তুত করোনা আতঙ্কে চিকিৎসক ও নার্সদের একটি বড় অংশ সব ধরনের চিকিৎসাসেবা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলেন। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) স্বল্পতা এবং সাধারণ রোগীরা যে করোনা আক্রান্ত নন, তা নিশ্চিত না হওয়ার কারণেই মূলত চিকিৎসা ব্যবস্থায় এ সংকট দেখা দেয়। চিকিৎসা একটি মহৎ পেশা বলেই স্বীকৃত। এমন নজিরও রয়েছে, নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও অনেক চিকিৎসক রোগীর সেবা দিয়েছেন। ডা. মঈন উদ্দীন এর একটি বড় উদাহরণ। সুচিকিৎসার অভাবে কোনো রোগী মারা গেলে তার দায় পড়ে গোটা চিকিৎসক সম্প্রদায়ের ওপর। কিন্তু চিকিৎসা ও সুযোগ বঞ্চিত হয়ে যদি একজন চিকিৎসকেরই মৃত্যু হয় তাহলে সে দায়টা কার?

পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন এই করোনাকালে, সব চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, টেকনোলজিস্ট, অ্যাম্বুলেন্সচালকসহ দায়িত্ব পালনরত সবার জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করা আবশ্যিক বিষয়। কিন্তু শুরু থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের অভাবের পাশাপাশি দায়সারা ভাবও ছিল। ডা. মঈনের মৃত্যুর পর তার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে।

তবে মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে মৃত্যুর আগে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব নেওয়াটাই যথার্থ বলে আমরা মনে করি। যুদ্ধে যেমন প্রশিক্ষিত সৈনিকের প্রয়োজন রয়েছে তেমনি দরকার উপযুক্ত অস্ত্র।

করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই চিকিৎসকদের নামিয়ে দিলে তা হবে অসম যুদ্ধ, যেখানে সৈনিকদের পরাজয় নিশ্চিত। যাদের রক্ষার জন্য এ লড়াই, এতে সে জাতিরও পতন ঠেকানো যাবে না। তাই করেনা যুদ্ধে জিততে হলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে অবহেলা করার আর বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of