ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ৭ মিনিট ৩২ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০, ২৪ আষাঢ়, ১৪২৭ , বর্ষাকাল, ১৬ জিলক্বদ, ১৪৪১

‘বি লা প’

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

সোহেল হায়দার চৌধুরী,নিরাপদ নিউজ: মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন জমিলা খাতুন। কানের কাছে একমাত্র ছেলে রহিম মিয়া বলছে-মা, মাগো কতদিন হয় তোর হাতের লবড়া খাইনা। গরম ভাত আর লাবড়ার গন্ধ পাচ্ছিরে মা। তুই আমারে একটু খাওন দে।
-আচমকা পঞ্চাশোর্ধ জমিলা হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসে বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, -রহিম, ও রহিম মিয়া, মানিক আমার, আস ভাত আর লাবড়া লইয়া মায় বইয়া রইছি। তুমি কাইমকাইজ শেষ কইরা আইলেই তুমারে লইয়া খামু।

-হুশ ফিরে আসে জমিলার। ডুকরে কেঁদে ওঠেন। সদ্য ছেলে হারানো জমিলার সে কান্নায় পুরো বাড়ি জেগে ওঠে।
প্রতিবেশীরা এ ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে জমিলা বেগমকে সান্তনা দিতে ছুটে আসে।
-খবরদার আমার কাছে কেউ আসবা না। বাইর অও ঘর থেইকা। আমার রহিম যহন হাসপাতালে, তার জানাযা ও দাফনের সময় এই মহব্বত তোমগো কই ছিল? জমিলা হাত দিয়ে সবাইকে চলে যেতে বলে।
-এগো সবাইরে আমি চিনি। সব নিজের স্বার্থটা দ্যাহে। পোলা আমার এতো কষ্ট করলো। মরণকালে কেউ হ্যার পাশে খারাইলো না। বিলাপ করে নিজে নিজেই বলতে থাকেন জমিলা।
একে একে রহিম মিয়ার জানাযা ও দাফনের সবকিছু ভেসে উঠতে থাকে জমিলার চোখে।
এক সন্ধ্যাবেলায় রহিম মিয়ার অনেক জ্বর, সঙ্গে প্রচণ্ড কাশি। মা তার মাথায় পানি দেয়, আর বুকে পিঠে সরিষার তেল মাখতে থাকে আল্লাহর নাম বলতে বলতে।
চারদিন পর গঞ্জের হাসপাতালে নিলে ডাক্তার ভর্তি করতে চায়নি। টানা দুই দিন হাসপাতালের বারান্দায় থেকে রহিম মিয়ার জ্বর-কাশি আরো বেড়ে যায়। সঙ্গে ডায়নিয়া। এবার সদয় হয়ে ডাক্তার তাকে ভর্তি করে। অনেক টেস্ট দেয়।
ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি নেয়ার পর হাফ ছেড়ে বাঁচে জমিলা খাতুন। তার বুকের ধন এবার ভালো হয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতে আল্লাহকে ডাকেন তিনি।
কিন্তু তিন দিন পর ডাক্তার জানালেন, রহিম মিয়া করোনায় আক্রান্ত। হাসপাতাল থেকে জমিলা খাতুনকে বের করে দেয়া হয়। একবুক কষ্ট নিয়ে ছেলেকে একা রেখে জমিলা ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে। আর ডাকতে থাকেন আল্লাহকে। একটানা ৪ দিন ছেলের কোনো খোঁজ পান না তিনি। হাসপাতালে গিয়েও ঢুকতে পারেন না একনজর দেখার জন্য।
এদিকে মায়ের মন পুড়তে থাকে। ৫ম দিন ছেলের জন্য খাবার নিয়ে হাসপাতালে যান জমিলা খাতুন। ঢুকতে না পেরে চত্বরেই বসে থাকেন। এর-ওর মাধ্যমে ছেলের খবর নিতে চান, পান না। একসময় ক্লান্ত জমিলা হাসপাতাল চত্বরের বেঞ্চিতে ঘুমিয়ে পড়েন।
-অ্যাই, আস্তে তোল। মুর্দা ব্যাথা পাইবো। এসব কথায় ঘুম ভাঙ্গে জমিলার। দেখে ৩/৪ জন মিলে একটি লাশ তুলছে হাসপাতালের ভাঙ্গা গাড়িতে।
জমিলার বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। রহিমের মুখটা ভেসে ওঠে চোখে। ছেলের সঙ্গে দেখা করার ছটফটানি আরো বাড়ে। কোনো উপায় বের হয় না।
-জমিলা না এইটা, কানে ভেসে আসে ওমর আলী মেম্বারের কণ্ঠ। কি কর এই হানে?
-রহিম মিয়ারে দেখবার আইছি। কিন্তু দেখা হইতাছে না। কাতর কণ্ঠে উদ্বেগের সঙ্গে বলে জমিলা।
-অ…বলে থামে োমর আলী মেম্বার। ধীরে ধীরে জমিলার মাথায় হাত রাখে। তারপর বলে রহিম মিয়াতো এই দুনিয়ায় নাই। করোনায়ভাইরাসে মারা গেছে কাইল। একটু আগে তার লাশ দাফনের জন্য লইয়া গেছে।
-ও, আল্লাগো, আমার লগে এ কি করলা? উদভ্রান্ত জমিলা হাসপাতাল চত্বর থেকে দৌঁঁড়াতে থাকে বাড়ির দিকে। সেখানে ছেলের লাশ না দেখে পাশের গোরস্তানে ছুটে যায়। দেখতে পায় হাত-মুখ-চোখ ঢাকা ৪/৫ জন লোক একটি লাশ কবরে নামাচ্ছে। জমিলা ছুটে গিয়ে লাশটি দেখার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। এরপর দ্রুত মাটিচাপা দেয়া হয় লাশটিকে।
-বাজানরে বলে জমিলা জ্ঞান হারায়। গভীর রাতে জ্ঞান ফিরলে দেখে অন্ধকার বারান্দায় শুয়ে আছেন তিনি। অসাঢ় দেহটাকে টেনে তুলে বাতি জ্বালিয়ে স্বামীহীন সংগ্রামী জমিলা খাতুন বিড়বিড় করেন, এ কেমন দ্যাশ, এ কেমন রোগ? মানুষরে মানুষ থেইকা আলগা কইরা ফালায়।
-ভাবতে ভাবতে সন্তানহারা জমিলা বিলাপ করতে থাকেন।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x