ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ১৯ মিনিট ২ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ৩ জুন, ২০২০, ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ১০ শাওয়াল, ১৪৪১

লকডাউনের ভুতুড়ে সন্ধ্যায় আমি এবং হিমু

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

এফ আই দীপু,নিরাপদ নিউজ: লকডাউনের এ সময়ে ঢাকা শহরের সন্ধ্যাটা একেবারেই ভুতুড়ে। এই খালি রাস্তায় হাঁটাটা কেন যেন খুব ভালো লাগে আমার। আশপাশে কেউ নেই। করোনাভাইরাসের ভয়ে সাধারণ মানুষের মতো ছিনতাইকারীরাও গর্তে ঢুকে গেছে। তার উপর আছে পুলিশ ও আর্মির ভয়। সন্ধ্যার পর বের হলেই কেলানি।

আমি এই ভুতুড়ে সন্ধ্যায় বের হই। কমলাপুর রেলস্টেশন হয়ে রাস্তাটা সোজা রাজারবাগ পুলিশলাইন, মৌচাক, মা‌লিবাগ হয়ে মগবাজারের দিকে চলে গেছে। আমি এ রাস্তা ধরেই হাঁটি। লকডাউনের প্রায় প্রতিদিনই হাঁটছি। একা, একেবারেই একা। মাঝে মধ্যে সন্ধ্যার নিরবতা ভেঙে সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের দু’একটি গাড়ি দেখা যায়। কিন্তু পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে দেখালেই কেল্লাফতে। পুলিশগুলোও বড্ড বেয়াডা। রাস্তা খালি, তবুও সাইরেন বাজাতেই হবে! এদিক থেকে আর্মিরা বেশ রাজকীয়। তারাও আসে। তবে চুপিচুপি। রাস্তায় দেখলেই সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনি বাইরে কেন? আমিও সত্যমিথ্যা বলে আইডি কার্ড দেখিয়ে দেই। তারাও পরামর্শ দিয়ে বিদায় নেন।

প্রতি ভুতুড়ে সন্ধ্যায় আমি কমলাপুর রেলস্টেশনের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যাই। একা একা। কিন্তু গত দুইদিন আর একা নই। বুঝতে পারি আমার পেছনে কেউ একজন হাঁটছেন। আমি থামলে তিনিও থেমে যান। পেছনে তাকিয়ে দেখি, খালি পায়ে পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষ। কাছে আসে না। নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে তিনিও পথ চলেন। আচ্ছা, তিনিও কী করোনার ভয়ে সামাজিক তথা শারিরীক দুরত্ব মেনে চলছেন? হতে পারে। নাহলে সামনে আসেন না কেন? প্রথমদিন আমি পাত্তা দিইনি। হয়তো আমার মতো ভুতুড়ে সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের ভুত দেখতেই তিনিও বের হন। কিন্তু আজ আর জিজ্ঞেস না করে পারলাম না। শারিরীক দুরত্বের আইন ভেঙেই পেছনে সরে গিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ালাম।

রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের ধবধবে আলোয় দেখি, গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরা। যথারীতি আজও পা খালি। মাথা নিঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। নাম জিজ্ঞেস করলাম।
: আপনার নাম কী?
: হিমু। বাবা নাম রেখেছেন হিমালয়। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ স্যার আমাকে হিমু নামেই ডাকেন। আপনি আমাকে হইলদা হিমু বলেও ডাকতে পারেন।

কথা শুনেই হো হো করে হাসি পেল। একগাল হেসেও নিলাম। আবার শুরু হলো তার সঙ্গে কথোপকথন-

: তো হিমু সাহেব, এই ভরসন্ধ্যায় আমার পিছু নিয়েছেন কেন?
: খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে।
: ইচ্ছে করলে খাবেন। কিন্তু আমার পিছু নিয়েছেন কেন, সেটা তো বললেন না।
: পকেটে টাকা নেই।
আমি বললাম, টাকা নেই ভালো কথা। কিন্তু চা খাবেন কীভাবে? এই করোনার দিনে সন্ধ্যার পর বের হওয়া নিষিদ্ধ, জানেন তো। দোকানপাট সব বন্ধ। একমাত্র বাসায় নিয়ে গিয়ে আপনাকে চা খাওয়াতে পারি। কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। ছোট বাচ্চা আছে আমার। সে ভয় পাবে আপনাকে দেখে। তাছাড়া লকডাউনের রাতে অপরিচিত কাউকে বাসায় নিয়ে গেলে বাচ্চার মাও রাগ করবে।

হিমু কিছু বলে না, মাথা নিচু করে আছে।
আমি বললাম, চা কী খুব বেশি ইচ্ছে করছে?
: জ্বী। গতকাল থেকেই মনে হয়েছে আপনার কাছে গেলেই চা পাওয়া যাবে।
হিমুকে বিশ্বাস না করার কোনো কারণ দেখছি না।
আমি বললাম: চা খাওয়ার টাকা নেই তো কী হয়েছে? আপনি তো মিসির আলীর কাছেও যেতে পারতেন। তার সঙ্গে তো আপনার অনেক ভাব। শুনেছি, আপনি কোনো সমস্যার সমাধান করতে না পারলে তিনিই সমাধান করে দেন। তো চায়ের সমস্যাটাও তো মিসির আলী সমাধান করে দিতে পারতেন।
: তার কথা মনে ছিল না। চায়ের জন্য মাথাটা এলোমেলো লাগছিল।
আমি বললাম, আপনাকে দেখে আমারও চায়ের তেষ্টা পেয়েছে। চলুন মিসির আলীর কাছে যাই। তিনি আমাদের চায়ের সমাধান করে দেবেন নিশ্চয়ই।
হিমু বললো, আপনি যখন বলছেন, তখন যাওয়া যায়।

হিমুর সঙ্গে আমিও পথচলা শুরু করলাম। মিসির আলীর বাড়িটা শাহজাহানপুরের রাস্তা ধরে যে রেলনাইটা মালিবাগের দিকে চলে গেছে তার ধারেই। হিমু পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছে। আমি তার পিছু পিছু হাঁটছি। দুর থেকে দেখা গেল চিপামতো এক জায়গায় একটি ঝুপড়ি ঘরে বাতি জ্বলছে। তার পাশেই পুরনো একটি বাড়ি। হিমু সোজা সেই ঝুপড়ি ঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমাকে বললেন, আপনি দাঁড়ান, আমি ভেতরে গিয়ে দেখি। হিমু বাড়ির গেটে উঁকি দিতেই সেই ঝুপড়ি ঘর থেকে রোগামতো এক লোক বেরিয়ে এলো। চড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো- কাকে খুঁজছেন?
হিমু বললন, মিসির আলী সাহেবের বাড়ি না এটা? তিনি আছেন?

লোকটি জানালেন, আমরা আসার মাত্র ১৫ মিনিট আগে মিসির আলী কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। আরও জানালেন, দু-একদিনের মধ্যে নাকি ফেরার সম্ভাবনাও নেই। তবে লোকটি যে ঠান্ডা মাথায় গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারেন, এটা স্বীকার করতেই হবে। কারণ, সারাদেশের গাড়ি যোগাযোগ এখন বন্ধ। মিসির আলীর ব্যক্তিগত কোনো গাড়িও নেই।

মিসির আলীর ঘরের পাশেই চায়ের টং দোকানদার সেই লোক। ঝুপড়ি ঘরের ভেতরে চায়ের গরম কেতলি ফুটছে। পুলিশের ভয়ে দোকানের ঝাপি ফেলে রেখেছেন। লকডাউনের রাতে পাড়ার ছেলেরা লুকিয়ে এসে চা বিড়ি ফুঁকে মুহুর্তেই চম্পট দেয়। হিমু লোকটির কাছে গিয়ে জানতে চাইল, আপনি মিসির আলী সাহেবকে চেনেন?
লোকটি এবার ভান ধরলেন। বললেন, ‘কোন মিসির আলী যেন, ওই যে পানের দোকানদার?’
হিমু বললেন- জ্বী জ্বী সেই মিসির আলীই, তবে পানের ব্যাপারটা আমার জানা নেই। তিনি পানও বিক্রি করেন নাকি?

দোকানদার আমাদের দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকালেন। ভয় পেয়েছেন। ভাবছেন পুলিশের লোক হয়তো। তবে ভয়টা প্রকাশ করলেন না। চোখমুখে রাগ তোলার চেষ্টা করলেন। তারপর হিমুর দিকে সেই রাগান্বিত দৃষ্টিতে বললেন, মিসির আলী সাহেবকে আপনাদের কি দরকার?
হিমু বললেন- এক কাপ চা খাবো তো, তাই তাকে দরকার ছিল। বলুন তো এখন চা খাই কোথা থেকে?
দোকানদার বিস্মিত হয়ে বললেন- তিনি নেই বলে চা খেতে পারছেন না?
হিমু বললেন- ঠিক ধরেছেন। তা তিনি কোথায় গেছেন বলতে পারবেন?
তিনি বললেন, মিসির আলী সাহেব তেতুলিয়া গেছেন মাসখানেকের জন্য।
হিমু বললেন- নিশ্চয়ই সমুদ্র দেখতে গেছেন?
লোকটি বললেন- ঠিক ধরেছেন।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছিলাম।
হিমু দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বললেন- টেকনাফ তো এখন কেউ যাবেই না। যেহেতু তেতুলিয়াতেই এতো সুন্দর সমুদ্র তৈরি করা হয়েছে। আমিও যাব ভাবছি। তা তেতুলিয়ায় যে সমুদ্রটা হয়েছে তার নাম কি? উত্তোরপসাগর নিশ্চয়ই?
দোকানদার এবার থতমত খেয়ে গিয়ে বললেন, ‘ভুল হইছে ভাই, তিনি তাহলে টেকনাফই গেছেন।
হিমু বললেন- ও তাই বলুন। তার মানে তিনি ওই পুরোনো সমুদ্রটাই দেখতে গেছেন? আচ্ছা, আমি তাহলে যাই। আজকে রাতে তিনি যখন বাসায় ফিরে আসবেন তখন আমার কথা তাকে বলবেন।

হিমুর কথা শুনে দোকানদার হা হয়ে গেলেন। বিস্ময়ে হা হয়ে যাওয়া মানুষদের দেখতে নিশ্চয়ই হিমুর ভালো লাগে। তাকে আরও বিভ্রান্ত করার জন্য হিমু একটা হাসি দিয়ে পিছন ঘুরে ফিরে চলা শুরু করলো। আমার দিকে ফিরেও তাকালো না। কোনো এক অমোঘ টানে আমিও তার পিছু নিলাম। কিছু দুর গিয়ে পেছন ফিরে দেখলাম, দোকানদার তখনও কাতলা মাছের মতো হা করে আমাদের গন্তব্যে চেয়ে আছেন। সাদা ধবধবে আলোয় তার বিস্ময়টা এখনও ঝলঝল করছে।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of