ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ১৭ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ১১ শাওয়াল, ১৪৪১

মুক্তিযুদ্ধের একজন আকবর চেয়ারম্যান

রকিবুল ইসলাম সোহাগ

নিরাপদ নিউজ

জাহিদ রহমান, নিরাপদ নিউজ: ২০১৫ সালের ২ মে। চিরতরে বিদায় নিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক স্পর্ধিত ইতিহাস, কিংবদন্তি অধিনায়ক আকবর হোসেন। মৃত্যূকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৯ বছর। আজ প্রিয় অধিনায়কের প ম মৃত্যুবার্ষিকী। আজন্ম সৎ ও সততার প্রতীক এই মানুষটি বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস ছিলেন। আর তাই সারাজীবন মানুষ আর মানুষের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সকল ধরনের দুর্নীতি ও দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন।

মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়ার নিভৃত পল্লীতেই থাকতেন চির প্রজ্ঞাবান এই মানুষটি। হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বাড়ি থেকে নেওয়া হয় যশোরের কুইন্স হাসপাতালে। ডায়াবেটিস অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া এবং অন্যান্য জটিলতা তৈরি হলে তিনি হাত ইশারায় চিরবিদায়ের সংকেত দেন। অতঃপর একটি ইতিহাসের প্রস্থান ঘটে। ঐদিনই তাঁর মরদেহ যশোর থেকে খামারপাড়া নিজ বাড়িতে আনা হয়। রাতে কফিন রাখা হয় তাঁরই প্রিয় কাচারি ঘরে। যেখানে তিনি নিত্যদিন বসে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতেন, সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন, হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠতেন। তাঁর কফিন আসার পরেই মানুষে মানুষে লোকারণ্য হয় অধিনায়কের বাড়ি। প্রিয় মুখটি দেখার জন্য ভ্যানে চড়ে, পায়ে হেঁটে শতসহ¯্র মানুষ ছুটে আসেন। মুক্তিযোদ্ধারা দাঁড়িয়ে স্যালুট দেন, অভিবাদন জানান।

৩ মে সকাল বেলা জানাযার জন্য অধিনায়ক আকবর হোসেনের কফিন নেওয়া হয় খামারপাড়া স্কুল মাঠে। রাখা হয় শহীদ মিনারে। হাজার হাজার মানুষ তাঁর জানাযায় অংশ নিতে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। মুক্তিযুদ্ধে মাগুরার বাইরে যতদূর তাঁর বাহিনীর শারীরিক উপস্থিতি ছিল সেই রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি, পাংশা, ফরিদপুরের মধুখালি, ঝিনাদহের শৈলকূপা, হরিণাকুন্ড, মহেশখালী-সবখান থেকেই মানুষ ছুটে আসেন প্রিয় অধিনায়ককে শেষ বিদায় জানাতে। অধিনায়কের শেষ বিদায়ের ক্ষণে মাইক্রোফোন হাতে নেন তাঁরই সহযোদ্ধা মাগুরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার মোল্লা নবুয়ত আলী। মাইক্রোফোন হাতে তিনি বললেন, ‘আকবর ভাই এর মতো সাহসী মানুষের জন্ম না হলে এই বাহিনীর জন্ম হতোনা। এই বাহিনীর জন্মদাতা তিনি আজ বিদায় নিলেন।’

একাত্তরে শ্রীপুরবাহিনীর জন্ম দিয়েছিলেন অধিনায়ক আকবর হোসেন, তিনি তখন শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এই বাহিনীই পরবর্তীতে সাধারণ্যে ‘আকবরবাহিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দেশের বিভিন্ন স্থানে যে কয়টি আ লিকবাহিনী আত্মপ্রকাশ করে শ্রীপুরবাহিনী তথা আকবরবাহিনী অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশকে সামনে রেখে একেবারে নিজেদের লোকায়ত জ্ঞান আর সাহসকে পুুঁজি করেই সেদিন নিজস্ব বাহিনী গঠন করেছিলেন। প্রথমিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতা আকবর হোসেন অপরাপর সহযোদ্ধা মোল্লা নবুয়ত আলী এবং বন্ধু মৌলভী নাজায়েত খোন্দকারকে পাশে রেখে শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে এই বাহিনীকে সংগঠিত ও সু-সংঘবদ্ধ করেন। কিন্তু দ্রুতই ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, যশোর, রাজবাড়ি, ঝিনেদা, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বিদ্রোহ করে আসা সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর, আনসার-মুজাহিদ সদস্যরা এই বাহিনীতে যোগ দিলে বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। পরবর্তীতে আশেপাশের বিভিন্ন থানা থেকে তরুণরা গোপনে এসে এই বাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধকালীন সময়ে ত্রিশটিরও বেশি ছোট বড় সম্মুখ যুদ্ধ ও প্রতিরোধে অংশ নেন এই বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই বাহিনী কখনও সম্মুখ আবার কখনও গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ করে বিভিন্ন স্থানে পাক বািহনী এবং তাদের দোষরদের পরাস্ত করে।

এই বাহিনীর দুঃসাহসী সব যুদ্ধ মাগুরা, রাজবাড়ী, ঝিনেদার যুদ্ধ ইতিহাসকে গৌরাবান্বিত করেছে। এখনও সাধারণ মানুষের মুখে এই বাহিনীর গল্প শোনা যায়। অধিনায়ক আকবর হোসেনের কারণেই একাত্তরে মাগুরার শ্রীপুর থানা কার্যত ছিল মুক্তা ল। পাকবাহিনী এবং রাজাকাররা কখনই শ্রীপুরে তাই স্থায়ীভাবে সক্রিয় থাকতে পারেনি। এমন কী কোনো ধরনের রাজাকার ক্যাম্প গড়ে তুলতে পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়। এটিও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এই বাহিনী বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের প্রতি এতোটাই অবিচল ছিল যে, শুধু নিজ এলাকা শ্রীপুরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা নয় একই সাথে মাগুরা সদর, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, ঝিনেদা মহকুমার বড় অংশ পাক হানাদার মুক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। নিজ এলাকার বাইরে গিয়ে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, ঝিনেদার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পাক আর্মি ও রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে দখল করে নেয়। স্বভাবতই আকবরবাহিনী পাকহানাদারদের কাছে ছিল এক মহাআতংক। এ কারণেই আকবরবাহিনীর প্রধান আকবর হোসেনকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করে পাকহানদাররা।
একাত্তরে এই বাহিনীর গড়ে উঠা, শত্রু প্রতিরোধ, রণকৌশল, গেরিলা যুদ্ধ দারুণভাবে প্রশংসিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধকালীন সময়ে ৮ নম্বর সেক্টর কর্তৃক এই বাহিনী বিশেষভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় সেক্টর আট এর সেক্টর কমান্ডার মেজর মো. আবুল মঞ্জুর আকবর হোসেনকে তাঁর নিজ এলাকায় গড়ে তোলা শ্রীপুরবাহিনীর ‘অধিনায়ক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সনদপত্র পাঠান।

মুক্তিযুদ্ধে অধিনায়ক আকবর হোসেন এবং তাঁর বাহিনীর অবদান অসামান্য। যুদ্ধের নয় মাস আকবর হোসেন যেভাবে যোগ্য, দক্ষ, সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল আ লিক বাহিনী পরিচালনা করেন তা দৃশ্যত বিরল এবং অভাবনীয়। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি একবারের জন্যেও ভারতে যাননি। নিজ দেশের মাটিতে থেকে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের এক ছাতার নিচে রেখেছেন। শুধু পাকবাহিনী আর তার সহযোগীদের প্রতিরোধ বা পরাস্ত নয়, স্থানীয় দস্যু ডাকাতদেরও এই বাহিনী শক্ত হাতে দমন করে এলাকার সাধারণ মানুষের জান মাল রক্ষা করেন। বিশেষ করে হিন্দুদের জানমাল রক্ষায় তিনি অনবদ্য ভূমিকা রাখেন। শুধু এই নয়, যুদ্ধের পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা য বাড়ি-ঘরে ফেরত এসে নিজেদের জমিতে চাষবাস করার সাহস না পেলে তিনি সম্প্রীতি বাড়ানোর লক্ষ্যে হিন্দু মুসলমানদের যৌথভাবে জমিতে চাষ করার উদ্যোগ নেন। এই প্রক্রিয়ায় একদিন শত শত হিন্দু মুসলামান একসাথে জমিতে চাষ করার জন্য লাঙল নিয়ে বড় বিলের জমিতে নামেন। এক অন্যরকম সম্প্রীতির উদাহরণ তৈরি করেন তিনি।

অধিনায়ক আকবর হোসেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবময় ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে থেকেই তিনি শিখেছিলেন রাজনীতিতে কতোটা সৎ ও নির্মোহ থাকতে হয়, কতোটা আত্মত্যাগ করতে হয়, কতোটা অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের হতে হয়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এই অনন্য অধিনায়ককে এই রাষ্ট্র কতোটা মূল্যায়ন করেছে তা অবশ্যই প্রশ্নের দাবি রাখে। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে একদিন মূল্যায়ন করবেই-এটাই সত্য। একদিন স্বপ্ন ও সত্যের ভোর আসবেই।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of