ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ২১ মিনিট ৫২ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৩১ মে, ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ৭ শাওয়াল, ১৪৪১

প্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এবং এক নারী ভক্তের অজানা কাহিনি

মাসুম বিল্লাহ

নিরাপদ নিউজ

গল্পটা উনিশ বছর আগের। আমার ছোট খালা বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে পড়ান। একদিন বিকেলে পড়িয়ে এসে খালা বলল, শুক্রবার রেডি থাকিস, তোর-আমার দাওয়াত আছে। কথাটা বলেই রহস্যের হাসি হাসল। একটার পর একটা প্রশ্ন করছি কিন্তু মুখ খুলল না। শেষে উপায় বের করলাম, ভাব নিয়ে বললাম, আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবে না।
– কেন?
– ছোট মামার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবো।
– তোর জন্য রান্নাবান্না হবে, আর তুই যাবি না! চোখ বড় বড় করে বলল ছোটখালা।
– তাহলে কাহিনি খুলে বল। নরমসুরে বললাম আমি।
আমার কথায় ছোটখালা বেদম হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে কাত হয়ে পড়ে। শেষে দম নিয়ে বলল, তোরে এক মহিলার কথা বলেছিলাম না…?
– কোন মহিলা?
– ক্যান, আমি যেখানে পড়াই…
– আরে ওখানে ত অনেক মহিলা, ঢং বাদ দিয়ে বল।
– ওরে বলদা, যে মহিলা ইলিয়াস কাঞ্চনের ভক্ত…

হুম, আমার মনে পড়ে, খালা প্রায়দিন এসে সেই কাঞ্চন ভক্তের গল্প বলে আমাকে। পড়ানোর ফাঁকে সবাই নানান বিষয়ে নাকি গল্প করে। গল্পের অন্যতম একটা টপিক- বাংলা সিনেমা, সিনেমার নায়ক-নায়িকা। এর মধ্যে একজন ইলিয়াস কাঞ্চনের কঠিন অন্ধভক্ত আছে, যার চোখে ইলিয়াস কাঞ্চন পৃথিবীর সেরা নায়ক। কাঞ্চনের হাসি সুন্দর। কান্না সুন্দর। চুল সুন্দর।  অভিনয় সুন্দর। মনের ভেতর সারাক্ষণ ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি। যেখানে নায়ক ঘোরাঘুরি করেন। বসবাস করেন।
এই সব কথা ছোটখালা আমাকে আগ্রহ নিয়ে বলত। কারণ, খালার এই ভাগ্নেও যে ইলিয়াস কাঞ্চনকে মাথার ভেতর নিয়ে নিয়ে দিন-রাতের সময়টুকু কাটিয়ে দিত। আজ এখানে ভাগ্নের গল্প আড়ালে থাকুক। আমরা বরং সেই অল্পবয়সী মহিলার গল্পে ঢুকে পড়ি।

আমার ছোটখালা প্রায় দিন আমাকে বলত, ওই মহিলা তো তোকে দেখতে চায়।

আমি অবাক হয়ে লজ্জিতভঙ্গিতে প্রশ্ন করতাম, আমাকে দেখতে চাইবে কেন? আমি তো আর ইলিয়াস কাঞ্চন না।

– কারণ, তুইও যে ইলিয়াস কাঞ্চনের ভক্ত! আমি তোর কথা ওনার কাছে অনেক দিন বলেছি।

– তাতে কি হলো?

– মহিলা প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, ম্যাডাম, আপনার বোনের ছেলেকে আনলেন না? তখন আমি তাকে বলেছি, তুই লজ্জা পাস এখানে আসতে।

কয়েকদিন পর। মহিলা ছোটখালাকে খুব করে ধরেছে, ম্যাডাম, এই শুক্রবার দুপুরে আপনার আর ভাগ্নের আমাগে বাসায় দাওয়াত। আপনারা না-আসলি আমি খুব কষ্ট পাবানি, না-আসলি আমিও আর পড়তে যাবো না কলাম।

শেষে আমারও আগ্রহ বাড়ল। ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্য একজন অচেনা মহিলা আমাকে দেখতে চায়, আমাদের বাসায় দাওয়াত দিয়েছে। এটা হেলাফেলার মতো কোনো বিষয় নয়। তাছাড়া দাওয়াত সবাই দিতে পারে না। সবাই যত্ন করতে পারে না।

সেদিন শুক্রবার।

দুপুর পর্যন্ত আমার অন্যরকম ভালোলাগা ঘিরে ধরল। আমি আর ছোটখালা সকাল থেকেই রোমাঞ্চিত। অজানা ভালোলাগায় ভাসলাম।

দুপুরে খালা আর ভাগ্নে সাজুগুছু করে বেড়িয়ে পড়লাম।

খুব বেশি দূরের পথ নয়। হেঁটেই গেলাম।

রাস্তার পাশেই ঘর। এক কামরার ভাড়া বাসা। গোলপাতার ছাউনি। বাঁশের বেড়া ছিল। এসব তখন আমাদের কাছে বিবেচ্য ছিল না। আমাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। আমার বেড়াতে এসেছি অনেক আনন্দ সঙ্গে করে।
পাশাপাশি নিজেদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।

আজ এত বছর পরও সেদিনের দৃশ্যগুলো স্পষ্ট চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে। আমাদের দেখে যেন আকাশের চাঁদ দেখছেন উনি। মনে হলো তার ঘরে কোনো রাজা-বাদশা পা রেখেছে। সত্যি বলছি, সেদিন লাজুক আমি ভেতরে ভেতরে পুরো গুটিয়ে গিয়েছিলাম।

কাঞ্চন ভাইয়ের সে মহিলা ভক্তের চোখে-মুখে অদ্ভুত খুশির ঝিলিক। গলা কাঁপছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। কি বলবে, কি করবে বুঝতে পারছিল না। যে কথা বলার প্রয়োজন ছিল না, সে কথাও টুপ করে বলে ফেলল- ম্যাডাম, আপনারা আসপেন সেজন্যি ঘর লেপিছি, ঘরদোর গুচাছি গুচাছি ম্যালা দেরি অয়েছে, মুরগিডা জবাই দিয়ে রান্না করতি করতি ১২ডা বাইজে গেছে… সারাদিন ভাইবেছি, আপনারা আসপেন না আসপেন না…

আমি দেখলাম ঘরের বেড়ার সঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চনের একটি ছবি যত্ন করে সাঁটানো। কাঞ্চনের ঠোঁটে চোরা হাসি।

আমরা খেতে বসলাম। মুরগীর মাংসের সঙ্গে অন্য কী পদ ছিল এতদিন পর তা আর মনে করতে পারলাম না। তবে খাওয়ার সময় মহিলা বার বার কী বলতেছিল, তা খুব মনে আছে- রান্না ভালো হয়নি, রান্না ভালো হয়নি…

খাওয়া শেষে আমি কাঞ্চন প্রসঙ্গ তুললাম। কিন্তু উনি লজ্জায় কোনো কথা বলতে পারলেন না। বার বার আচলে মুখের হাসি লুকোনের চেষ্টা করেছেন।

আজ এত বছর পর দুই বাচ্চার মায়ের নামটি মনে পড়ছে না। ছোটখালার কাছে জানতে চাইলাম, ওর-ও মনে নেই। আগে যে জায়গায় থাকত সেখানে গিয়ে খোঁজ নেওয়াটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছি না।

তবে শুধু এইটুকু জানি, সারা বাংলাদেশে এই রকম লক্ষ লক্ষ ইলিয়াস কাঞ্চনের ভক্ত, দর্শক ছড়িয়ে আছে। যাদের বুকের ভেতর একজন ইলিয়াস কাঞ্চন প্রিয় নায়ক হয়ে আছেন।

যাদের খোঁজ আমরা কেউ কখনো রাখিনি, খোঁজ কখনো আর পাবোও না। তাদের জন্ম তো ২০০০ সালে নয়, যে, তারা ফেসবুকে আসবে, লিখবে তাদের কথা।

সেদিন ওই বাসা থেকে চলে আসার পথে ছোটখালা আমাকে বলল, আমার ছাত্রীর অবস্থা তো খুব খারাপ।

আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, কেন কী হলো, ভালোই তো দেখে আসলাম, মুখ টিপে হাসতেছে…

ছোটখালা বলল, আমার ছাত্রী প্রায় রাতে ইলিয়াস কাঞ্চনকে স্বপ্নে দেখে, আজ রাতেও নাকি স্বপ্ন দেখেছে…

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of