ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ২ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৩১ মে, ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ৬ শাওয়াল, ১৪৪১

পুলিশ স্বামীর নির্যাতনে ঘরছাড়া গৃহবধূ: সন্তানকে নিয়ে ঘুরছেন পথে পথে, চাইছেন নিরাপত্তা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

নিরাপদ নিউজ

পঞ্চগড়ে পুলিশ স্বামীর নির্যাতনে ঘরছাড়া হয়ে এক গৃহবধূ তার দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন। চাইছেন নিরাপদ আশ্রয়। গত সোমবার স্বামীর পরিবারের লোকজনের মারধরে অসুস্থ ওই গৃহবধূর ঠাঁই হয়েছে এখন পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে ওই গৃহবধূ এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আশ্রয় মেলেনি নিজের বাবার বাড়িতেই। প্রেমে পড়ে ওই পুলিশ সদস্যকে বিয়ে করায় তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের ক্রমাগত নির্যাতনের ছাপ তার চোখে মুখে। ১৮ বছর বয়সী ওই গৃহবধূর নাম জামিয়াতুন নেছা জুঁই। বাড়ি দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়া এলাকায়। সে ওই গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে। তার শ্বশুর বাড়িও একই গ্রামে। তার স্বামী আকতারুজ্জামান সৈয়দপুরে আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নে কর্মরত। আকতারুজ্জামান ওই এলাকার মৃত দেলোয়ার হোসেন ছেলে।

জানা যায়, দেবীগঞ্জ রিভারভিউ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ছাত্র আকতারুজ্জামানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে জুঁইয়ের। একপর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কও গড়ে উঠে তাদের মধ্যে। একসময় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে কিশোরী জুঁই। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে আকতারুজ্জামানের পরিবার তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে জুঁই। পরে মামলা তুলে নেওয়ার শর্তে সমঝোতা হয়। ইসলামী শরিয়া মোতাবেক জুঁইকে বিয়ে করে আকতারুজ্জামান। তবে কাজীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা হয়নি পুলিশে আকতারুজ্জামানের চাকরি বাঁচানোর শর্তে। বিয়ের পরও জুঁই বাবার বাড়িতেই থাকত। ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর জুঁই একটি কন্যাসন্তান প্রসব করে। পরে চাপে পড়ে তাকে বাড়ি নিয়ে বাধ্য হয় আকতারুজ্জামান।

জুঁইয়ের অভিযোগ, চাপে পড়ে জুঁইকে গ্রহণ করলেও বিয়ের পর থেকেই তার ওপর স্বামী আকতারুজ্জামানসহ তার পরিবারের নির্যাতন শুরু হয়। টর্চার সেলের মতো করে পরিবার সবাই তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন শুরু করে। সন্তানসহ জুঁইয়ের জায়গা হয় শ্বশুর বাড়ির রান্নাঘরে। এমনকি ধান কাটা থেকে শুরু করে বাড়ির যাবতীয় কাজ সবাই তাকে দিয়েই করিয়ে নিত। তবে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না জুঁই ও তার সন্তানকে। এমনকি কাপড় চোপড়রও দেওয়া হতো না তাদের। নির্যাতন সইয়ে মাটি কামড়ে স্বামীর বাড়িতে ছিলেন জুঁই। তাদের কথার অবাধ্য হলে মাঝে মধ্যেই ঘরে তালাবন্ধ করে আটকে রাখা হতো।

আকতারুজ্জামান ছুটিতে বাড়ি ফিরলে সেও জুঁইকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করত। সে কর্মস্থলে থাকলেও জুঁইয়ের সাথে কথা বলতে দিত না তার পরিবারের লোকজন। বেশ কয়েকবার জুঁইকে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন মারধর করে বের করে দেয়। আবার মামলার ভয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। গত ১৭ মার্চ স্বামীর সাথে সৈয়দপুরে দেখা করতে যাওয়ার অপরাধে জুঁইকে বাড়ি থেকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয় তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন। পরে সে আশ্রয় নেয় বাবার বাড়িতে। সেখানে প্রতিদিন বাবা জসিম উদ্দিনের বকাঝকা ও মারধরের শিকার হতে হয় তাকে। একপর্যায়ে গত সোমবার সকালে আবারো শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য যায় জুঁই। কিন্তু বাড়িতে ঢোকার আগেই ওই পরিবারের লোকজন তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেয়। পরে জুঁই আশ্রয়ের জন্য পথে পথে ঘুরে বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে সন্তানকে নিয়ে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়।

হাসপাতালে ভর্তি জুঁই পুলিশ স্বামী ও তার পরিবারের লোকজনের নির্যাতনে আজ পথে পথে আশ্রয়ের জন্য ঘুরছেন। জায়গা হয়নি দরিদ্র বাবার বাড়িতেও। স্বামী ও তার পরিবারের নির্যাতন থেকে মুক্তি চায় সে, চায় নিরাপদ আশ্রয়।

জুঁই বলেন, আমার স্বামী আর্মড পুলিশে চাকরি করে। সে এখন সৈয়দপুরে আছে। আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে চাপে পড়ে সে আমাকে বিয়ে করে। কিন্তু আমাকে আজো স্ত্রীর পর্যাদা দেয়নি। এমনকি তার চাকরি বাঁচানোর জন্য আমাকে কাজী দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে বিয়ে করেনি। বিয়ের পর থেকেই আমার ওপর সে ও তার পরিবারের লোকজন নির্যাতন করত। আমার স্বামী কর্মস্থলে থাকলে তার তিন ভাই স্কুল শিক্ষক আব্দুল মালেক, তার স্ত্রী আম্বিয়া আক্তার সিমা, জিআরপি পুলিশের সদস্য আব্দুল খালেক, তার স্ত্রী তাসলিমা বেগম, আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী বন্যা আক্তার আমাকে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করত। যেন আমি তাদের নির্যাতনে বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। আমাকে ঘরের ভেতরে মাঝে মধ্যেই তালাবন্ধ করে রাখত। আমাকে ও আমার সন্তানকে ঠিকমতো খেতে দিত না। এক কাপড়ে মাসের পর মাস থাকতে হতো। জন্মের পর থেকে আমার মেয়েকে আমি একটু ভালো খাবার মাছ, মাংস, ডিম খাওয়াতে পারিনি। ঘরের ভেতর রশি ও বিষ দিয়ে তারা আত্মহত্যা করতে বলত। কয়েক বার তারা আমাকে মারধর করে বের করে দিয়েছে। বিচারের ভয়ে আবার বাড়িতে নিয়ে গেছে। এই বয়সে আমি আমার সন্তানের দিকে চেয়ে সব নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করেছি। গত ১৭ মার্চ আগে আমি আমার স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য সৈয়দপুরে তার কর্মস্থলে যাওয়ার কারণে তারা আমাকে বাড়ি থেকে মারধর করে বের করে দেয়। পরে আমি আশ্রয় নেই আমার বাবার বাড়িতে। সেখানে বাবাও আমাকে মারধর করত, বকাবকি করত। সোমবার সকালে আমি আবার শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য গেলে আমাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেয় তারা। আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার সন্তানটার জন্য পারিনি। এখন আমার কোনো আশ্রয় নেই। কোথায় যাব জানি না। আমি কি এই নির্যাতনের বিচার পাব না?

জুঁইয়ের প্রতি কোনো নির্যাতন করা হয়নি দাবি তার স্বামী পুলিশ সদস্য আকতারুজ্জামান বলেন, জুঁইকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। আমার ভাইদের সবার আলাদা সংসার। তারা আমার স্ত্রীকে নির্যাতন করবে কেন। তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়নি। সে নিজেই বের হয়ে গেছে।

আকতারুজ্জামানের বড় ভাই জিআরপি পুলিশের সিপাই আব্দুল খালেক বলেন, আমার পরিবারের লোকজন যদি জুঁইকে নির্যাতন করে থাকে তবে তাদেরও বিচার হওয়া দরকার। তার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। যদি আমার পরিবারের লোকজন দোষী হয় তবে তাদেরও শাস্তি পাওয়া উচিত। আর জুঁই দোষ করলে তারও শাস্তি হোক। এলাকার আমাদের একটা সুনাম আছে। আমার ছোট ভাই ও জুঁই সেই সুনাম নষ্ট করেছে। আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। এর একটা সুষ্ঠু সমাধান হওয়া দরকার।

জুঁইয়ের বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, মেয়েটিকে তার শ্বশুর বাড়িতে দিনের পর দিন নির্যাতন করত। তার ভাসুর ও জা’রা সবাই মিলে বাড়ি থেকে তাড়াতে চরম নির্যাতন করত। পরে আমার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। আমি গরিব মানুষ। করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়েছি। তাই মাঝে মধ্যে জুঁইকে বকাঝকা ও চড়-থাপ্পরও দিয়েছি। এর জন্য আপনারা চাইলে আমাকে শাস্তি দিতে পারেন। আমি ওকে আমি ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়তে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওই ছেলের সাথে সম্পর্ক করে সব শেষ করে দিয়েছে। অনেক ক্ষতি হয়েছে আমার। ওরা মামলা তুলে নেওয়ার শর্তে আমার মেয়েকে বউ করে নেয়। মামলা তোলার পর এখন তারা আমার মেয়েকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। ওরা অনেক প্রভাবশালী। তাই যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে। আমি এর ন্যায্য বিচার চাই।

টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সরকার বলেন, অনেক আগে থেকেই এই গোলমালাটা চলছে। ওই মেয়ে আদালতে মামলাও করেছে। এর আগে আমি দুই পরিবারকে নিয়ে বসে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলাম পারিনি। দেবীগঞ্জ থানার ওসি রবিউল হাসান সরকার বলেন, এ বিষয়ে নতুন করে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of