আপডেট মে ১২, ২০২০

ঢাকা বুধবার, ২৭ মে, ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ , গ্রীষ্মকাল, ৩ শাওয়াল, ১৪৪১

একজন ইলিয়াস কাঞ্চন: ‘দ্য ফাস্ট এন্ড লাস্ট সুপারস্টার’

মা সু ম বি ল্লা হ

নিরাপদ নিউজ

ইদানিং ( এ বছর) ফেসবুকে বাংলা সিনেমাবিষয়ক গ্রুপ, পেজ এ সয়লাব। বিষয়টি বাংলা সিনেমার জন্য পজিটিভ দিক।

কিন্তু সব গ্রুপেই সবাইকে সিনেমা বোদ্ধা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পোস্টদাতা
কমেন্টসদাতাসহ প্রায় সবাই উত্তেজিত, রেগে রেগে একে অপরের সঙ্গে তর্ক
করছে। মতের মিল না-হলেই কুৎসিত গালি দিচ্ছে। বিশেষ করে ভক্তশ্রেণির লোকজন অন্যকে সহ্য-ই করতে পারছে না।

২০০০ সালে যাদের জন্ম সেও সবজান্তার মতো পোস্ট দিচ্ছে, মনগড়া কথা লিখে, কমেন্টের অবস্থা ত আরো খারাপ, পোস্ট না-বুঝে হা হা রি-অ্যাক্ট
দিচ্ছে, কেউ কাউকে চিনে না, জানে না, অথচ বাজে কমেন্ট করছে অারেকজনকে নিয়ে।

অামার এ কথা কাউকে অাহত করতে নয়। অামার দেখাটা বললাম। সরি।
ভাইবন্ধুসকল।

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম ছবি ‘বসুন্ধারা’সহ পর পর ৪টি ছবিই অসাধারণ (ডুমুরের ফুল, ’শেষ উত্তর’, ’সুন্দরী’। শেষ উত্তর, সুন্দরী ছবি দুটো সবাইকে দেখতে আহবান জানাই। বুঝতে পারবেন, ঘষেমেজে অভিনয় আর রক্তে থাকা অভিনয়ের তফাত। কাঞ্চনের প্রথম ছবিতে যে অভিনয় করেছে তা অনেকে শত ছবিতে অভিনয় করার পরও পারবে না। ‘বসুন্ধরা’ তে পুরষ্কার পাওয়ার মতো অভিনয় করেছিল ইলিয়াস কাঞ্চন। শোনা গিয়েছিল পুরষ্কার পাবে কিন্তু পায়নি। এক পরিচালক (আলমগীল কবির) তখন কাঞ্চনকে বলেছিলেন, তুমি পুরষ্কার পাওনি, কিন্তু এখন থেকে তুমি ছবি পাবে। কথাটা সত্য হয়েছিল। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করছে কাঞ্চন ভাই।

আমি প্রায়শ একটা কাজ করি, যারা এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে, এখনো সব নায়কদের নাম জানে না, চেনে না, তাদেরকে কয়েকজনের ছবি দেখতে বলি, তারপর দেখা হলে জানতে চাই, কোন ছবিটা ভালো লেগেছে।
বিশ্বাস করেন, তারা সবাই ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবির কথা, অভিনয়ের কথা বলেছে। তখন তাদের বলি, এই হলো ইলিয়াস কাঞ্চন।

আমার স্ত্রীর তার সময়ে একমাত্র রিয়াজ-শাবনূর ছাড়া আর কাউকে চিনত না তেমন। তাদের ছবিই দেখেছে। ইলিয়াস কাঞ্চনের নামও জানত না। তাকে আমি ইলিয়াস কাঞ্চনের অনেকগুলো ছবি দেখিয়েছি সিডিতে। আরো কয়েকজন নায়করে ছবিও দেখিয়েছি। ফলাফল এখন, বলে, ইলিয়াস কাঞ্চন সত্যি ভালো অভিনেতা। অনেকের চেয়ে শতগুন ভালো।
হয়ত আপনারা এই পদ্ধতি গ্রহণ করবেন না। মানবেন না।
তা না-মানুন, তাতে তো আমাদের কারোর কিছু যায়-আসবে না। জাস্ট বললাম।

যারা সিনেমা দেখেন, সিনেমা নিয়ে অনেক কিছু বলেন। অনেক পোস্ট দেন। তুমুল তর্ক করেন। অন্যকে হেয় করেন। মানুষকে আঘাত দিয়ে কথা বলেন। গালি দেন। তাদের বলবো, ইলিয়াস কাঞ্চন এর ছবি দেখুন। অন্যদের ছবিগুলোও দেখুন। তখন আপনার মন যা সায় দেবে তা বলবেন, মানবেন।

যদি সত্যি সিনেমা বুঝেন, অভিনয় বুঝেন তাহলে আমি নিশ্চিত আপনি ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতি মুগ্ধ হবেন। তারপর কোনো অভিনেতাকে নিয়ে বাজে কথা বলতে দ্বিধা করবেন।

কাঞ্চনের প্রথম কয়েকটা ছবি ব্যবসা করেনি। সাহিত্যমানের ছিল।

প্রথম সুপারডুপার হিট হলো “আখিমিলন’’। তুমুল ব্যবসা করেছে। নায়ককে আর পিছনে তাকাতে হয়নি।

এরপর “অভিযান” ছবিটিও হিট ছবি। এরপর “তিনকন্যা” সুপার হিট।

একে একে অারো অনেক ছবি “বাল্যশিক্ষা”, ’’ভাইবন্ধু’’, ’’প্রতিরোধ’’, ’’মর্যাদা’’।

“সহযাত্রী” ‘‘নীতিবান’’ আলোচিত, ব্যবসাসফল সিনেমা। সুপার ডুপার হিট।

“ভেজাচোখ” একটি মাইলফলক সিনেমা। এক একজন দর্শক অনেকবার সিনেমাটি দেখেছে। আমার ছোট মামা টানা ১৭ বার দেখেছে। আমি ১৯৯৯ সালে প্রথম দেখার সুযোগ পাই সিনেমা হলে। এরপর সিনেমা আর কোনো সিনেমা হলে চলেনি। ছবিটির আর কোনো খোঁজ জানি না। প্রযোজক ইকবাল সাহেব বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে মারা যান।

“প্রেম প্রতিজ্ঞা”। ছবিতে কাঞ্চনের অভিনয় দেখেছেন? পারবে এমন অভিনয় করতে কোনো নায়ক? ছবিও কাঞ্চনের অনেক প্রিয়।

“শঙ্খমালা” ‘‘বেদের মেয়ে জোছনা’’র পর ব্যবসা করে তুমুল ব্যবসা করে।

“বিশ্বাস অবিশ্বাস” “বাদশা ভাই”। দর্শকের পছন্দের সিনেমা।

“অচেনা” ছবিটাও টানা ৫ সপ্তাহ হলে চলেছে।

“বাপ-বেটা ৪২০”, “মা মাটি দেশ” “মাটির কসম” সুপার ব্যবসা সফল মুভি।

“চাকর” হিট সিনেমা। টানা একমাস হলে চলেছিল।

“বেনাম বাদশা” “খুনী অাসামী” এন্টি হিরো। দর্শক কাঞ্চনকে ভালো ভাবে গ্রহণ করেছিল। বিগ হিট মুভি। আমি এক দর্শককে চিনি, তখন ছেলেটি নাইন এর ছাত্র, আমি এইট। আমরা একই বাসায় থাকতাম। সামাদ নামের সে ছেলেটি খুনী আসামী ছবির সংলাপ মুখস্ত বলত সারাদিন। আর আমাকে ক্ষেপাত। কারণ, আমি সিনেমাটি দেখিনি। কিন্তু কপাল ভালো আমার, ১৯৯৫ সালে ঢাকার সনি সিনেমা হলে ছবি আবার মুক্তি দিল। নতুন করে। কারণ ছবিটি দর্শক প্রিয় ছিল বলেই তো। আমি দেখলাম। দেখলাম এক দাপুটে অভিনেতার দাপুটে অভিনয়।

“ত্যাগ”, “মহৎ” “সিপাহী” “সৎ মানুষ” “চরম অাঘাত” “অাসামী গ্রেফতার” “ভাংচুর” “স্বজন” “মৃত্যুর মুখে” “স্পর্ধা” প্রতিটি সিনেমা বাম্পার হিট।

অারো অনেক ছবি অাছে যা উল্লেখ করলাম না।

একটা গ্রুপে একজনকে দেখলাম, লিখেছে, বেদের মেয়ে জোছনা ছবিতে নায়কের তেমন দরকার ছিল না, ভূমিকা নেই, যে-কাউকে নিলেই চলত।
তিনি আরেকটি প্রশ্ন রেখেছেন, বেদের মেয়ের পর কাঞ্চনের দ্বিতীয় ব্যবসাসফল ছবির নাম কী?

আমার কাছে পোস্টটি অযথা, ফালতু, মশকরা মনে হয়েছে।

’’বেদের মেয়ে জোছনা’’ ছবিটি অন্য একজন নায়ককে নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরিচালক বকুল সাহেব প্রযোজক পানু সাহেবকে গো ধরে বলেছিল, কাঞ্চন ছাড়া আমি ছবিটি বানাবো না। উল্লেখ্য যে, ছবিটি একক পরিচালক হিসেবে বকুলের প্রথম ছবি, প্রথম সুযোগ।
এখন বুঝতে হবে, কাঞ্চন কী ছিলেন!
পরে কাঞ্চনকে পরিচালক দারাশিকো সাহেব ছবিটি করতে অনুরোধ করেন। কাঞ্চন এবং দারাশিকো সাহেব এর ‘‘বোনের মতো বোন’’ ছবির কাজ বন্ধ রেখে বেদের মেয়ে ছবির কাজ করেছিলেন কাঞ্চন।

এ ছবিটি একটি ইতিহাস। যারা তখন অবুঝ বা জন্মেনি, তারা কেমন করে বুঝবে তখন সারাদেশে কী ঘটেছিল সিনেমাটি নিয়ে।

যখন মুক্তি পায় তখন অামি দুই বার দেখছি। তারপর এ ছবি একটার পর একটা ঘটনার জন্ম দিয়েছে। কাঞ্চনকে এ ছবিতে গুরুত্বহীন বলেছেন যিনি তাকে আমি কোনো দর্শকের মধ্যে ধরছি না।
এবং সে এ সিনেমাটা দেখেনি বলে সন্দেহ অামার।

যাইহোক,
কথা বললে আরো অনেক কিছু বলতে পারি। আজ থামছি।

আমি কাউকে অাহত করতে চাইনি। লাভও নেই। ইচ্ছাও নেই। আমরা কেউ কারো শত্রু নেই।

অাসুন। অযথা তর্ক নয়। বাংলা সিনেমার সুদিন ফিরুক। সে কামনা করি।

কাঞ্চনের যুগ নেই। তাই, তর্ক করার মানে হয় না।

কাঞ্চনের সময়ে যারা প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, প্রদর্শক, দর্শক, সাংবাদিক ছিলেন তারা জানেন কে কাঞ্চন, কী কাঞ্চন!

ভালো থাকবেন সবাই।

পুনশ্চঃ
ফালতু ত্যানা প্যাচানো বন্ধ করেন, অাপনারা সিনেমা দর্শক নন। আপনারা ইউটিউবে সিনেমা খোঁজেন দেখার জন্য। আপনাদের এত তথ্য, উপাত্ত, গবেষণা, ফেসবুকে পন্ডিতি বাংলা সিনেমার কোনো মঙ্গল করবে না। পারলে গঠনমূলক সমালোচনা, আলোচনা করেন। অযথা একে অন্যের সঙ্গে তর্ক, ঝগড়া, গালিতে জড়িয়ে নিজের সময় নষ্ট হবে। বরং বাসায় পড়াশুনো করুন। নিজের মঙ্গল করুন। ফেসবুকে সেলিব্রেটি হয়ে সংসার চলবে না।
এইটুকু না-লিখে পারলাম না। সরি।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of