আপডেট ৩১ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০, ২১ আষাঢ়, ১৪২৭ , বর্ষাকাল, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪১

‘পাকা মার্কেটের সেই ডিসপেনসারি’

দুলাল মাহমুদ

নিরাপদ নিউজ

শৈশবের পর বেশ কিছু দিন বড়সড় রোগ-বালাই না থাকলেও একদম সুস্থ-সবল ছিলাম না। কিছু না কিছু শারীরিক পীড়ন তো সইতে হয়েছে। মাঝে-মধ্যে জ্বর এসে একটু-আধটু জ্বালাতন করতো। জ্বর হলে ঘরবন্দি থাকাটা ছিল বাধ্যতামূলক। সে সময় নিজেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মতো অসহায় মনে হতো। জ্বরের চিকিৎসা হতো মূলত ঘরোয়া পদ্ধতিতে। তাপমাত্রা মাপা হতো সাধারণত হাত দিয়ে। তবে থার্মোমিটারও ব্যবহার করা হতো। কাঁথা গায়ে দিয়ে সারাক্ষণ শুয়ে থাকতাম। আর দর দর করে ঘামতাম। গা মুছিয়ে দেওয়া হতো ভেজা গামছা দিয়ে। তাপমাত্রা বেশি হলে খাটের আড়াআড়ি শুইয়ে দিয়ে শরীরের নিচে ওয়ালক্লথ বিছিয়ে দেওয়া হতো। যাতে পানিতে বিছানা ভিজে না যায়। তারপর বালতিতে ভরে এনে মগ দিয়ে মাথায় ঢালা হতো পানি। মাথায় দেওয়া পানি আরেকটি খালি বালতিতে পড়তো। অনেক সময় পানি গড়িয়ে চলে যেত চোখে। কানেও একটু-আধটু ঢুকে পড়তো। আমার কাছে তা ছিল অস্বস্তিকর। সুড়সুড়ির মতো লাগতো। আমি নড়াচড়া করতাম। তখন গামছা দিয়ে পানি মুছিয়ে দেওয়া হতো। কখনো-সখনো করা হতো বকাঝকা। দেওয়া হতো জলপট্টিও। তবে সবচেয়ে কষ্টকর ছিল খাওয়া-দাওয়া। মুখে কোনো স্বাদ থাকতো না। তেতো তেতো লাগতো। খাওয়ার রুচি একদমই হতো না। প্রধান খাদ্য ছিল সাগুবার্লি। এটা খেতে কী যে বিস্বাদ লাগতো, বোঝানো যাবে না। কে যে এই খাবার পয়দা করেছেন, আল্লাহ মালুম। গ্লুকোজ খেতে খুব একটা অসুবিধা হতো না। আর দেওয়া হতো দুধে ভেজা পাউরুটি। জ্বর মানেই যেন স্বাদহীন সব খাবারের আয়োজন। প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ কি ছিল? ভাত-তরকারির নাম নেওয়া যেত না। তাতে নাকি জ্বর বাড়তো। জ্বর সারার পরে ঘটা করে ঘি দিয়ে গরম গরম ভাত খাওয়ানো হতো। সঙ্গে কালিজিরা ভর্তা। তবে একটা খাবার আমার খুব প্রিয় ছিল। হরলিক্স। সেটা অবশ্য সচরাচর দেখা পাওয়া যেত না। জ্বরমুখে খেতে খুব একটা ভালো লাগতো না। দুধের সঙ্গে গুলিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় খাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। তখন তো আর আমার অগ্ৰাধিকার থাকতো না। বাধ্য হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে খেতাম। তাড়াহুড়ো করে শুকনো খেতে গিয়ে অনেক সময় গলায় আটকে যেত। তখন সবচেয়ে অভিজাত খাদ্য তালিকায় ছিল আপেল-কমলা-আঙুরজাতীয় ফলফলাদি। কদাচিৎ দেখা মিলতো। কী উপলক্ষে যে তাঁদের সাক্ষাৎ পেতাম, স্মরণ করতে পারছি না।

সে সময় আরেকটি রোগ ছিল খুবই বিশ্রী। খোস-পাঁচড়া আর চুলকানি। চুলকানির ঠেলায় অস্থির হয়ে যেত জীবন। আর পাঁচড়া হতো হাতেপায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে। ভিতরে পানির মতো জমে সাদা সাদা ফোস্কা পড়তো। টনটনে ব্যথা করতো। গলে গেলে কেমন একটা দুর্গন্ধ লাগতো। কঠিন হয়ে পড়তো চলাফেরা। সবচেয়ে বড় কথা, দেখলে গা কেমন গুলিয়ে আসতো।
অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল ফোড়া। পেকে গিয়ে টসটস করতো। কী যে অসহনীয় ব্যথা! আবার শরীরের এমন সব জায়গায় হতো, যা ছিল খুবই বিব্রতকর। বিভিন্ন আকারের হতো। বড়গুলোর চেয়ে ছোটগুলোর দাপট ছিল বেশি। এটাকে বিষফোড়াও বলা হতো। যখন টাটানি শুরু হতো জীবন-জগৎ এলোমেলো হয়ে যেত। পরিপূর্ণভাবে পাকার পর সুই দিয়ে ভেতরের পুঁজ বের করে দিলে আরাম পাওয়া যেত। কিছু কিছু ফোড়া শরীরে স্থায়ী দাগ রেখে যায়। অবশ্য কোনো কোনো জটিল ফোড়ার জন্য অপারেশনের প্রয়োজন পড়তো। সে সময় শরীরের মধ্যে কত পুঁজ যে জমা থাকতো, কারণে-অকারণে বের হওয়ার জন্য উদগ্ৰীব হয়ে পড়তো।

খোস-পাঁচড়া আর চুলকানির প্রতিষেধক হিসেবে বিভিন্ন রকম ওষুধের পসরা ফুটপাতে সাজিয়ে বসতেন ক্যানভাসাররা। বিক্রির জন্য আঁটতেন কত রকম কলাকৌশল আর ফন্দিফিকির। জমিয়ে তুলতেন গান-বাজনার আসর। ক্যানভাস করার সময় মুখের কোনো আগল থাকতো না। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে অপ্রস্তুত হতে হতো। কেউ কেউ অবশ্য মজাও পেতেন। না হলে তো আসর জমজমাট হয়ে ওঠতো না।

খোস-পাঁচড়া ও ফোড়া এখন আগের মতো দেখা যায় না। তার পরিবর্তে নিত্য-নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। সব কিছুর বিবর্তন হলে রোগ-বালাইয়ের না হওয়ার তো কারণ নেই। তাছাড়া আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে পুরানো রোগ-বালাই হার মানলেও তারা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। মহাভারতের যোগমায়ার করা অভিশাপের মতো,

‘তোমারে বধিবে যে
গোকুলে বাড়িছে সে।’

আমরা তো তেমনটি দেখতে পাচ্ছি। একটার পর একটা অনাহুত রোগ এসে আমাদের কাবু করে দিচ্ছে। তার সর্বসাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত করোনাভাইরাস। কীভাবে কীভাবে যে সর্বগ্ৰাসী এই রোগটি গোকুলে বেড়ে ওঠেছে, সেটা কেউ ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি। এখন তার নিধন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। কবে যে তার সুমতি হবে? কবে যে তিনি থামবেন?

যা লিখেছিলাম, ছোটখাটো চিকিৎসার জন্যে শের-এ-বাংলা নগর পাকা মার্কেটে ছিল একটি সরকারি ডিসপেনসারি। সকালবেলা একজন চিকিৎসক বসতেন। সঙ্গে কম্পাউন্ডার। স্লিপ কেটে চিকিৎসকের কাছে যেতে হতো। টাকা পয়সা নেওয়া হতো না। সেখান থেকে ওষুধ দেওয়া হতো সর্বসাকুল্যে দুই কি তিন প্রকার। খোস-পাঁচড়ার জন্য পুঁইশাকের দানা কিংবা কালির দোয়াতের রঙের মতো এক শিশি তরল। নাম মনে নেই। পটাশিয়ামজাতীয় কিছু কি? আচ্ছা, সাদা রঙের কোনো পাউডার কি দেওয়া হতো? বোধহয় বরিক পাউডার। তবে সঙ্গে দেওয়া হতো এক বান্ডিল তুলা। তুলা দিয়ে ওই তরল আলতার মতো করে খোস-পাঁচড়ার উপর লাগাতে হতো। আরেকটা ওষুধ ছিল। সব রোগের সেই একটাই দাওয়াই। পানির মতো হালকা মিষ্টি একটা সিরাপ। খেতে খারাপ লাগতো না। দেওয়া হতো খাঁজ কাটা কাগজ লাগানো একটি শিশিতে। খাঁজ দেখে দেখে পরিমাণ মতো খেতে হতো। আর মিক্সচারজাতীয় কিছু কি ছিল? দিয়ে বলা হতো, একদাগ, দুইদাগ বা তিনদাগ খেতে হবে। এ ধরনের ওষুধ দিয়েই দিনের পর দিন চলতো চিকিৎসা। তাতেই মোটামুটিভাবে সবাই সুস্থ থাকতেন।

সে সময় চিকেন পক্স বা গুটিবসন্ত, হাম জাতীয় রোগ খুব হতো। এরজন্য সাধারণত চিকিৎসা ও ওষুধের প্রয়োজন হতো না। কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললেই নির্ধারিত কিছু দিনের মধ্যে সুস্থ হওয়া যেত। তবে নিম গাছের বেশ উপযোগিতা ছিল। অবশ্য গুটিবসন্ত ছিল ছোঁয়াচে। রোগটি মোটেও সুবিধার ছিল না। মুখের সৌন্দর্য নষ্ট করে দিত। সারা মুখে রাবার স্টাম্পের মতো যে ছাপ মারতো, তা আর কখনোই মুছে ফেলা সম্ভব হতো না। গরমের দিনে ঘামাচি তো লেগেই থাকতো। খুবই বিরক্ত করতো। ঘামাচির জন্য ছিল আলাদা পাউডার। কেউ আদর করার মতো পাফ দিয়ে পাউডার ধীরে-সুস্থে শরীরে বুলিয়ে নিতেন। অনেক সময় কৌটার ছিদ্রগুলো আটকে থাকতো। কেউ কেউ এমন জোরে কৌটা ঝাঁকুনি দিতেন, বেরিয়ে আসতো গাদাখানেক পাউডার। সারা শরীর সয়লাব হয়ে যেত পাউডারে পাউডারে। তাতে খানিকটা আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যেত। কেউ মমতা বা সোহাগ করে ঘামাচির পিঠ চুলকিয়ে দিলে কী যে সুখ পেতাম, তার কোনো তুলনা হয় না। এমনিতেও চুলকানির আলাদা একটা মজা আছে। সে সময় রেডিও ও টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হতো পাউডারের কত রকম বিজ্ঞাপন। মিল্লাত ট্যালকাম ঘামাচি পাউডার, জনসন বেবি পাউডার ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা, বৃষ্টিতে কি ঘামাচি নিরাময় হয়? ঘামাচির কুটকুটানি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অনেকে বৃষ্টিতে ভিজতেন। এখন এই জাতীয় সমস্যাগুলো তেমনভাবে নেই বললেই চলে।

আর বড় বড় রোগের চিকিৎসার জন্য ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, যক্ষা হাসপাতাল। হাসপাতালের জন্যে শের-এ-বাংলা নগর এলাকার যথেষ্ট সুখ্যাতি রয়েছে। এখন তো যোগ হয়েছে আরও নতুন নতুন হাসপাতাল। কিন্তু স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে ছোট্র পরিসরের পাকা মার্কেটের সেই ডিসপেনসারি।

তবে ডেলিভারি কেসের জন্য সুখ্যাতি ছিল ‘জি’ টাইপের সুরুজ ভাইয়ের আম্মার। তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সিনিয়র নার্স ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ফর্সা রঙ, কালো পাড়ের সাদা শাড়ি আর ভারী ফ্রেমের চশমায় তিনি হেঁটে যাবার সময় একটা সমীহ ভাব জেগে ওঠতো। তাঁর হাত দিয়ে কত কতজন যে দেখেছেন পৃথিবীর আলো। সেই শিশুরা এখন কে যে কোথায় আছে?

ছোটখাটো চিকিৎসার জন্যে আরেকজনের কথা খুব মনে পড়ে। হিন্দু ভদ্রলোক। খুবই নিরীহ ধরনের। হালকা-পাতলা গড়ন। ‘এইচ’ টাইপে থাকতেন। কোথায় যেন ছোটখাটো চাকরি করতেন। সম্ভবত জাতীয় সংসদ ভবনে। দাসবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। কবিরাজি চিকিৎসা করতেন। তাঁর সঙ্গে সর্বক্ষণ একটা চামড়ার ব্যাগ থাকতো। ব্যাগের মধ্যে থাকতো তাঁর চিকিৎসার বিভিন্ন উপকরণ। তিনি মাঝে-মধ্যে আমাদের বাসায় আসতেন। আবার খবর দিয়েও আনতাম। আমাদের খুচরা-খাচরা চিকিৎসা করতেন। পড়ালেখার প্রতি অমনোযোগিতার জন্য আমাকে সম্ভবত স্বর্ণ সিঁদুরের সঙ্গে দুধের সর মিশিয়ে খেতে দিতেন। তাতে খুব একটা হেরফের না হলেও তাঁর কথা, তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতির কথা খুব মনে পড়ে।

মনে পড়ে সেই সময়টাকেও। যখন জীবন ছিল ছোট ছোট পরিসরে বাঁধা। ছোট ছোট অসুখ। ছোট ছোট ওষুধ। আর ছোটখাট চিকিৎসালয়। বড় কোনো অসুস্থ ভাবনা আমাদের তাড়িত করতো না।

মন্তব্য করুন

Please Login to comment
avatar
  Subscribe  
Notify of