ব্রেকিং নিউজ

আপডেট জুন ১৫, ২০২০

ঢাকা সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২০, ১৯ শ্রাবণ, ১৪২৭, বর্ষাকাল, ১২ জিলহজ, ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন পরিবর্তনের বাস্তব গল্প: ‘আত্বচিৎকার কিন্তু আত্বহত্যা নয়!’

মুস্তারী রহমান সেতু

নিরাপদ নিউজ

২০১০ সাল’ বগুড়া পলিটেকনিক্যালে পড়ার সময় একই ক্লাসের ক্লাসমেট সোহেলকে ভালোবেসে বিয়ে করলাম। কলেজ জিবন শেষ করে দুজন চাকরি নিলাম নারায়ণগঞ্জের কাচঁপুরের একটি ফ্যাক্টরিতে।

বিজ্ঞাপন

সময় ২২শে আগষ্ট ২০১৫ সাল সকাল ১১টায় সোহেলের হাত ধরে অফিস থেকে ফিরছিলাম, আমি তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, রাস্তার পাশে দাড়িয়ে আছি রাস্তাটা পার হবো বলে, হটাৎ একটা ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার দুটো পায়ের উপর দিয়ে চলে গেলো, চোখ মেলে দেখলাম একটা অপরিচিত লোক আমাকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছে…..।

আমাকে কাচপুর জেনারেল হসপিটালে নিয়ে গেলো, সেখানে সোহেল এমন ভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো যে আমি আমার পা দেখতে ই পাইনি। এরপর পঙ্গু হাসপালে নেয়া হলো, অপারেশন থিয়েটারে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল বিকাল পাঁচটা ততক্ষনে আমার পায়ের টিস্যু গুলো মরে গেছে।কতজনকে মিনতি করেছি আমাকে একফোঁটা পানি দাও আমার কলিজা টা ফেটে যাচ্ছে, আমার মিনতি শুনে এক ভাবি নিজের নখ ভিজিয়ে আমার মুখে ধরতো। আমার অপারেশন মাঝে বন্ধ করে দিয়ে ডাক্তার জানালো আমার পায়ের সবগুলো রগ ছিঁড়ে গেছে অপারেশন হৃদরোগ ইনন্সিটিটিউটে করতে হবে। আমাকে রাত আটটার দিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো অপারেশন শেষে ডাক্তার বললো পা কেটে ফেলতে হবে খুব তাড়াতাড়ি তারপর একে একে স্কয়ার এ্যাপোলো হসপিটাল সবাই বললো পা আর রাখা যাবেনা অনেক দেরি হয়ে গেছে, ভোর চারটায় ফিরে আসলাম পঙ্গু হাসপাতালে যত দ্রুত সম্ভব পা কেটে ফেলতে হবে, পরদিন সকালেই আমার পা হাটুর উপর থেকে কেটে ফেলা হলো শেষ বারের মতো নিজের পা দেখে নিলাম,আর ভাবলাম আজ থেকে আমি সবার থেকে আলাদা আজ থেকে আমি পঙ্গু। মনে শান্তনা নিলাম আমার মেয়েটা আমার পেটে সুস্হ আছে ও দুনিয়ায় আসবে আমার সব কষ্ট মুছে যাবে।

সোহেল আমি আর মেয়ে তিনজন ভালই থাকবো। দেড়মাস পর সিজার করে মেয়ে হলো বিশ ঘন্টা পর মারা গেলো একবার দেখতেও পারলাম না। এবার শুরু হলো বাচার লড়াই।

আমার এক্সিডেন্ট হওয়ার পর আমি বুঝতেই পারিনি পা ছাড়া জীবন কতটা দূর্বিষহ হতে চলেছে। বোঝার মতো অবস্থায়ও ছিলাম না আসলে, ভাবলাম একটা পা নেই তাতে কি আমি বেঁচে আছি আমার পেটের সন্তান ভালো আছে, আমার স্বামী বেঁচে গেছে, আমি না হয় সকলের পা দিয়ে চলবো।কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা, যখন বুঝতে পারলাম আমি সবার মতো আর স্বাভাবিক জীবন কোনদিনই ফিরে পাবোনা। প্রতিবন্ধীর খাতায় নাম চলে গেল আমার।আমার মেয়েটাও আমাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলো।

ধীরে ধীরে আমি ডিপ্রেশন এ চলে গেলাম বহু বার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছি,বিশ্বাস করুন তখন প্রতিনিয়ত ভাবতাম এ জীবনের কোন মানেই হয়না।আমার বেঁচে থেকে কি লাভ??? সোহেল অনেক বুঝানোর চেষ্টা করতো আমার কারোর কথাই ভালো লাগতোনা কেবল ভাবতাম এ জীবন চাই না। তখন আমার ইন্ডিয়া তে চিকিৎসা চলছে আমার ডিপ্রেশন তখন চরম অবস্থায় কারণ আমার পা লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না। একজন ডাক্তার আমার পাশ দিয়ে যাবার সময় বললো তোমার সাথের লোক কোথায়?? সোহেল তার সঙ্গে দেখা করতেই উনি আমাকে সাইকাইট্রিস্ট দেখাতে বললেন, পরদিন সোহেল আমাকে নিয়ে গেলো একজন সাইকাইট্রিস্ট এর কাছে।

আমার ট্রিটমেন্ট চললো বেশ কিছুদিন, ডিপ্রেশন কমে এলো।পা লাগানো হলো আলহামদুলিল্লাহ, ডাক্তার এর একটাই উপদেশ ছিলো আমাকে কোন দোকান বা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান করে দেয়ার যেনো আমি ভালো থাকি।সারাদীন কাজে ব্যাস্ত থাকি।অনেক বাধা বিপত্তি বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ আমি ভালো আছি মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমত আর আমার স্বামী বাবা মা পরিবারের সকলের সহযোগিতায়। আপনাদের সাথে আজ আমার নিজের জীবনের না বলা কথাগুলো শুধু একটা কারণে শেয়ার করলাম আপনাদের কারো যদি মনে হয় আপনি হতাশায় ভুগছেন তাহলে please একজন ডাক্তার এর সাথে পরামর্শ করুন।

ডিপ্রেশন কোন মামুলি সমস্যা নয়।একজন ডাক্তার কত ভালোভাবে যে আপনার মানসিক ভাবে ভেঙে পরা অবস্থাকে স্বাভাবিক করে দিবে আপনি তা কল্পনাও করতে পারবেন না। আমাদের দেশে তো মনরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার প্রচলন খুবই কম ” তাই ভবিষ্যতে কারো এরকম জিবনে দূর্দিনে হতাশ না হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ ভিষন জরুরী “।

ডিপ্রেশন থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে অনেকে নেশা, বা অনৈতিক কাজের সাথে জরিয়ে পরে যা পরবর্তি জিবনের আশাকে আরো কমিয়ে দেয়।

অনেক কিছু বলে ফেলেছি ভুল হলে নিজগুণে ক্ষমা করবেন। বর্তমানে আমি বগুড়া বিসিক এলাকায় মেইন রাস্তার সাথে ” সুরাইয়া স্টোর” নামে একটা ফটোকপি ষ্টেশনারী ও রেস্টুরেন্টের মালামাল সাপ্লাইয়ের দোকানে দিয়েছি! আমাদের জন্য সকলে দোয়া করবেন।

বিসিক, বগুড়া।
বগুড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, বগুড়া
পাওয়ার টেকনোলজি (২০০৮-০৯ সেশন)।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x