ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ২৬ মিনিট ৩২ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০, ৩১ আষাঢ়, ১৪২৭ , বর্ষাকাল, ২৩ জিলকদ, ১৪৪১

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন: কামাল লোহানীর প্রয়াণ

সম্পাদকীয়

নিরাপদ নিউজ

কোভিড–১৯ মহামারিতে আমরা অনেক কৃতী মানুষকে হারিয়েছি। সেই তালিকায় যুক্ত হলেন সাংবাদিক, শব্দসৈনিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। এ ক্ষতি অপূরণীয়।

তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৪ সালে, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। ছাত্রজীবনেই তিনি বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ কারণে মুসলিম লীগ সরকারের আমলে তাঁকে ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে দুবার কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৫৫ সালে দৈনিক মিল্লাত নামের একটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশাগত দায়িত্ব ছিল না; ছিল গণতন্ত্র তথা রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারও। পাকিস্তান আমলে জেলখানা থেকে সংবাদপত্র অফিস কিংবা সংবাদপত্র অফিস থেকে জেলখানা অনেক সাংবাদিক–লেখকের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কামাল লোহানী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবিরোধিতার বৈরী সময়েও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য শ্যামায় বজ্রসেনের চরিত্রে অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৬২ সালে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

কামাল লোহানী কয়েক বছর সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন; ‘ক্রান্তি’ নামে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ আমলে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় গণশিল্পী সংস্থা। সবশেষে তিনি উদীচীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে এসব সাংগঠনিক পদ ও দায়িত্বের মধ্যে তিনি বৃত্তাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সবার আপনজন। এটাই ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

কামাল লোহানী আজীবন লড়াই করেছেন গণমানুষের মুক্তি ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য। যে দেশে পদ–পদবির জন্য অনেক মানুষ উন্মুখ, সে দেশে তিনি একাধিকবার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। নীতিতে অবিচল থেকেছেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হওয়ার পর দলে দলে সাংবাদিকেরা তাতে যোগ দেন, কিন্তু সেদিন যে মুষ্টিমেয় সাংবাদিক বাকশালে যোগ দেননি, তাঁদের মধ্যে কামাল লোহানী ছিলেন অগ্রগণ্য।

জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েও তিনি যাননি। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যেতে হলে তাঁকে স্যুট–টাই পরতে হবে। কামাল লোহানী সারা জীবন পায়জামা–পাঞ্জাবি পরে এসেছেন; সেই পোশাক বদলাতে রাজি হননি।

নব্বইয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি সরকারের সময় তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর অসম্মানজনক আচরণের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। পরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আরেকবার প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে তাঁকে একুশে পদক দেওয়া হয়।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কামাল লোহানীর ভূমিকা ছিল অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে পরিচিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও বার্তা বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বর বেতারে বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণাটিও তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর তিনি কিছুদিন বাংলাদেশ বেতারে কাজ করেন, তারপর ১৯৭৩ সালে সংবাদপত্রজগতে ফিরে আসেন।

কামাল লোহানী জীবনের শেষ পর্বে এসে বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা যে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা পূরণের পথ এখনো অনেক বাকি রয়ে গেছে। আগামী প্রজন্ম তাঁর সেই স্বপ্নের উত্তরাধিকার বয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x