ব্রেকিং নিউজ

আপডেট জুলাই ৬, ২০২০

ঢাকা শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০, ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৭, বর্ষাকাল, ১৬ জিলহজ, ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯: ভয়াবহ অবস্থার সন্মুখে বিশ্ব

এস এম আজাদ হোসেন

নিরাপদ নিউজ

বিশ্বে এখনও করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ শুরুই হয়নি, কারণ গোটা বিশ্ব এখনও এর প্রথম ধাক্কাই সামলে নিতে পারেনি। এখন পর্যন্ত এক কোটি পনের লাখের বেশি লোক এই ভাইরাসে সংক্রামিত হয়েছেন। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে,যদিও তুর্কমেনিস্তান, উত্তর কোরিয়া, এন্টার্কটিকা এগুলোর বাইরে। এদিকে চীন, তাইওয়ান এবং ভিয়েতনামের মতো কয়েকটি দেশ দ্রুতই ভাইরাসটিকে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে ভাইরাসটি এখনও তার তাণ্ডব চালাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ মহামারীটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে; আর আফ্রিকার বেশিরভাগ অঞ্চলে এটি রয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। আর এ দুয়ের মাঝে অবস্থান করছে ইউরোপ-ইকোনোমিস্ট।
তবে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থাটি এখনও আসার অপেক্ষায় বলে সতর্ক করেছে দ্য ইকোনোমিস্ট। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির একটি দল ৮৪টি দেশে চালানো তাদের এক গবেষণার ভিত্তিতে বলছে যে-প্রতিটি নতুন শনাক্তের বিপরীতে আক্রান্ত ১২ জনই অশনাক্ত থেকে যাচ্ছে। আর প্রতি দুটি মৃত্যুর বিপরীতে তৃতীয়জনের অন্য কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
এমতয়াবস্থায় আমরা যদি উত্তর আমেরিকা,দক্ষিণ আমেরিকা,এশিয়া,ইউরোপ,আফ্রিকার দেশগুলির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে সত্যি এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।বিশ্বখ্যাত জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে ৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার ২১৩ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৩ জন। নতুন করে প্রাণ গেছে ৩ হাজার ৩০৩ জনের। এ নিয়ে করোনারায় মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮৬ জন মানুষ।
আর ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৬৫ লাখ ৩৫ হাজার ৯০২ জন।গত ২৪ ঘন্টায় সুস্থ্য হয়েছেন ৯৫ হাজার ৮১৩ জন।বিশ্বে বর্তমানে মধ্যম মানের আক্রান্ত ৪৪ লাখ ২৭ হাজার ৯৮৫ জন এবং গুরুতর অসুস্থ্য ৫৮ হাজার ৫৪০ জন।
উত্তর আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর অবস্থা খুবই খারাপ। যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৯ লাখ ৮২ হাজার ৯২৮ জন।সবচেয়ে বেশি মৃত্যুও হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৬৯ জন। আক্রান্তের মতো সুস্থ হওয়ার দিক থেকেও সবার শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে এ পর্যন্ত অন্তত ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৫৪ জন করোনা রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। আক্রান্তের দিক দিয়ে বিশ্বে ৯ম স্থানে মেক্সিকোতে মোট আক্রান্ত ২ লাখ ৫৬ হাজার ৮৪৮ জন।মোট মৃত্যু ৩০ হাজার ৬৩৯ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬০৪ জন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে ব্রাজিল,পেরু চিলি আক্রান্তের দিক দিয়ে যথাক্রমে ২য়,৫ম ও ৭ম স্থানে রয়েছে। আক্রান্তের ও মৃতের সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই ২য় অবস্থানে উঠে এসেছে ব্রাজিল। দেশটিতে এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬ লাখ ৪ হাজার ৫৮৫ জন আর আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৪ হাজার ৯০০ জন। এখন পর্যন্ত ব্রাজিলে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬১৫ জন সুস্থ হয়েছেন।
৫ম স্থানে পেরুতে মোট আক্রান্ত ৩ লাখ ২ হাজার ৭১৮ জন, মোট মৃত্যু ১০ হাজার ৫৮৯ জন আর সুস্থ্য হয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৫৭ জন।
৭ম অবস্থান চিলিতে মোট আক্রান্ত ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৩২ জন।মোট মৃত্যু ৬ হাজার ৩০৮ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৩২ জন।
এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থা খুবই খারাপ।ভারতের পর ইরান,পাকিস্তান,সৌদি আরব,তুরস্ক ও বাংলাদেশে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারত আক্রান্তের সংখ্যায় বিশ্বে ৩ নম্বরে উঠে এসেছে।ভারতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৮৩৬ জন, আর এখন পর্যন্ত মৃত্যু ১৯ হাজার ৭০০ জনের।ভারতে সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ২৪ হাজার ৮৯১ জন।
একাদশতম অবস্থান ইরানে মোট আক্রান্ত ২ লাখ ৪০ হাজার ৪৩৮ জন।মোট মৃত্যু ১১ হাজার ৫৭১ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৩৩০ জন।
দ্বাদশতম পাকিস্তানে মোট আক্রান্ত ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৭৪ জন।মোট মৃত্যু ৪ হাজার ৭১২ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৩০ জন।

বিজ্ঞাপন

ত্রয়োদশতম সৌদিআরবে মোট আক্রান্ত ২ লাখ ৯ হাজার ৫০৯ জন।মোট মৃত্যু ১ হাজার ৯১৬ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৩৬ জন।
চতুর্দশতম তুরস্কে মোট আক্রান্ত ২ লাখ ৫ হাজার ৭৫৮ জন।মোট মৃত্যু ৫ হাজার ২২৫ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৮০ জন।
এদিকে বাংলাদেশে গেল ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোভিড ১৯ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৩৮ জন। দেশে মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬২ হাজার ৪১৭ জনে। এছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৫৫ জন মারা গেছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫২ জনে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন আরও এক হাজার ৯০৪ জন।এতে মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৭২ হাজার ৬২৫ জনে।বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম।
ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে রাশিয়া,স্পেন,ইউকে,ইটালি,জার্মানি করোনা আক্রান্তে এগিয়ে রয়েছে। আক্রান্তে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রাশিয়ায় এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৮১ হাজার ২৫১ জন। আর মারা গেছেন ১০ হাজার ১৬১ জন।অপরদিকে সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ৫০ হাজার ৭৫০ জন।
৬ষ্ঠ অবস্থানে স্পেনে আক্রান্ত ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২৫ জন, মৃত্যু ২৮ হাজার ৩৮৫ জন আর সেরে উঠেছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫৮ জন।
এর পরের অবস্থানে যুক্তরাজ্য, এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪১৬ জন। মৃতের সংখ্যায় তৃতীয় দেশটিতে মারা গেছেন ৪৪ হাজার ২২০ জন।
দশম স্থানে ইতালিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৪১ হাজার ৬১১ জন।দেশটিতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৮৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে।আর ইতিমধ্যে ইতালিতে সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৯২ হাজার ১০৮ জন।
পঞ্চদশতম জার্মানিতে মোট আক্রান্ত ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫৮ জন।মোট মৃত্যু ৯ হাজার ৮৬ জনের এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১ লাখ ৮২ হাজার ২০০ জন।
আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে সাউথ আফ্রিকা,মিশর পর পর অবস্থানে আছে।
বিশ্বে ষোড়শতম সাউথ আফ্রিকায় মোট আক্রান্ত ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৫০ জন। মারা গেছেন ৩ হাজার ১৯৯ জন এবং সুস্থ্য হয়েছেন ৯৩ হাজার ৩১৫ জন।
অপরদিকে মিশরে মোট আক্রান্ত ৭৫ হাজার ২৫৩ জন। মারা গেছেন ৩ হাজার ৩৪৩ জন এবং সুস্থ্য হয়েছেন ২০ হাজার ৭২৬ জন।
দ্য ইকোনোমিস্ট এর তথ্যমতে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষণা দলটি বলছে, কোনও চিকিৎসা অগ্রগতি বা প্রতিষেধক ব্যতীত ২০২১ সালের মধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২০ থেকে ৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আর এই সময়ে ১৪ থেকে ৩৭ লাখ মানুষ প্রাণ হারাবে। তারপরেও তখন বিশ্বের ৯০% এরও বেশি মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবে। যদি না একে দ্রুতই আটকানো সম্ভব হয়।
এই ভাইরাসটি কতটা ছড়াবে তা নির্ভর করে মূলত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ওপর। করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যায় মূলত তিনটি ধাপে- টেস্টিং, ট্রেসিং (শনাক্ত) ও আইসোলেশন (পৃথকীকরণ)। এগুলো ব্যর্থ হলে সবশেষ ধাপ হলো- লকডাউন। এছাড়া স্বাস্থ্য সেবার খরচটাও থাকতে হবে জনগণের সাধ্যসীমার মধ্যেই। কারণ, সুচিকিৎসার কারণেই ব্রিটেনে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি রোগীর সংখ্যা মার্চের ১২ শতাংশ মে মাসে নেমে ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, চলমান এ মহামারি পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে অর্থনীতিও। যদিও এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা বেশ নাজুক। এ অবস্থায় চলতি বছরে ৩৯টি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১০ শতাংশ হ্রাস পাবে বলেই জানিয়েছে জেপি মর্গান ব্যাংক।
আসলে, উপযুক্ত ওষুধ বা প্রতিষেধক ছাড়া এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে মানুষের সামাজিক আচরণের ওপর। সংক্রমণ রোধে সাহায্য করলেও ইউরোপ-আমেরিকার অনেকেই মাস্ক পরতে রাজি নয়। হাতধোয়া ভাইরাস নিধন করে, কিন্তু অনেকেই পুরোনো অভ্যাস ছাড়তে পারছে না। মহামারির মধ্যে পার্টি করা বিপজ্জনক, কিন্তু তরুণদের তাতে থোড়াই কেয়ার। তার ওপর, সময় যত যাচ্ছে মানুষের অর্থের সংকটও তত বাড়ছে। ফলে কাজের প্রয়োজনেই বাইরে বের হতে হচ্ছে অনেককেই।
মূল সমস্যাটা হচ্ছে- সামাজিক রীতিনীতি বদলে দেয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। এজন্য দরকার জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা এবং বিশ্বাস স্থাপন। যদিও অনেকেই নিজ দেশের নেতাদের বিশ্বাস করেন না। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রাজিল, ইরান তথা এশিয়ার অনেক দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীরা করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিকে হেলাফেলা করেছেন, ভুলভাল পরামর্শ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন তারা। অনেকের কাছেই দেশের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষাই বড় বলে মনে হয়েছে।
ইকোনোমিস্টের এই প্রতিবেদনটির সারকথা হলো- মহামারী এই করোনা ভাইরাস শিগগিরই যাচ্ছে না। আরও বহু মানুষ এতে আক্রান্ত হবেন, মারাও যাবেন অনেকে। তবে মনে রাখতে হবে, আপনার হয়তো করোনার নিয়ে আগ্রহ কমে গেছে, কিন্তু আপনার ওপর করোনার আগ্রহ একদমই কমেনি।

লেখক-সাংবাদিক, সমাজকর্মী, সম্পাদক

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x