ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ১ মিনিট ১০ সেকেন্ড

ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১০ আশ্বিন, ১৪২৭, শরৎকাল, ৭ সফর, ১৪৪২

বিজ্ঞাপন

একটি সড়ক দুর্ঘটনাই ইরফানের স্বপ্নের মৃত্যু

শফিক আহমেদ সাজীব

নিরাপদ নিউজ

আশা এমন এক জিনিস, যা মৃত্যুর শেষ ক্ষণটি পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আশায় বার বার প্রলোভিত হয়েও মানুষ তাকেই আঁকড়ে ধরে। আশাবাদী মানুষ আবার সব একরকম হয় না। একেক মানুষের আশার মাপকাঠি হয় ভিন্ন ভিন্ন। তারা আশায় আশায় দিন কাটায়। ব্যর্থ হলেও হতাশ না হয়ে পুনরায় আশায় বুক বাঁধে। তারা শত দুঃখ কষ্টেও ‘ভালো কিছু হবে’ এ আশায় থাকে। পুরোপুরি ‘ভালো কিছু’ না পেলেও আশার কিছু অংশ পুরণ হলেই তারা বেজায় খুশি হয়। আশার এই কিছু অংশই তাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। একে বলে অল্পতেই তুষ্ট এবং যা পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ বলে শোকর গুজার করা। তারা মনে করে, এই অল্পই একদিন অনেক বেশি হয়ে দেখা দেবে। তা না হলে যেসব অকল্পনীয় ও অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে, এসব ঘটনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো, তা অনুমান করা কঠিন নয়। তেমনই এক বিস্ময়কর ঘটনার গল্পের নায়ক প্রতিভাবান ফুটবলার মোঃ ইরফান হোসেন।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কালারপোল ক্রীড়া সংস্থার হাত ধরে ২০১০ সালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকার এক প্রতিভাবান ফুটবলার মোঃ ইরফান হোসেনের পথচলা শুরু। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ইস্পাহানি মহানগরী পাইওনিয়ার। পাশাপাশি রাফা ক্লাব। ২০১২ সালে নোয়াখালি ফুটবল একাডেমি থেকে গ্রামীণফোন ফেডারেশন কাপে অংশগ্রহণ। পরে ঢাকায় ১ম বিভাগ ফুটবল লীগে সানরাইজ স্পোর্টিং ক্লাবের সাথে দলবদল করেন। এভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল একজন ফুটবলার ইরফানের খেলার জীবন।

খেলায় যার আগ্রহ দেখে বাবা মার স্বপ্ন ছিল পুরোটা ইরফান জুড়েই। ছেলে বড় হয়ে একদিন দেশের নামকরা ফুটবলার হবেন। ইরফান ফুটবল খেলার পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিল। কর্ণফুলী উপজেলার নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ জে চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এ জে চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ এবং চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ (৪ সেমিস্টার)। তবে আর বেশি দুরে এগিয়ে যেতে পারেননি, এখানেই থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে ইরফানকে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনা।

২০১৬ সালে ২২ নভেম্বর সন্ধ্যা। শহর থেকে ফুটবল খেলে শিকলবাহায় ফিরছিলেন ইরফান। ফিরিঙ্গী বাজার ফেরীঘাট থেকে সাম্পান করে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে সিএনজি যোগে মইজ্জ্যার টেক যাচ্ছিলেন। পথে ঘটে মর্মান্তিক ও হৃদয়স্পর্শী এক সড়ক দুর্ঘটনা। দ্রুতগতির সিমেন্ট বোঝাই তিন চাকা একটি গাড়ি বাম্পারের সাথে আঘাত লাগে ইরফানের ডান পায়ে। ধাক্কায় সড়ক থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। পরক্ষণে পায়ের উপর দিয়ে চলে যায় দ্রুতগতির সিমেন্ট বোঝাই তিন চাকা গাড়িটি।

স্থানীয়রা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুদিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল। সেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই সপ্তাহ চিকিৎসার পর জানানো হয় ইরফানের ডান পায়ের হাঁড় ভেঙ্গে থেঁতলে গেছে। বেশ গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত অংশে পঁচন ধরেছে। তাই ডান পায়ের হাটুর উপরের অংশ পর্যন্ত কেটে ফেলতে হবে তা না হলে পুরো শরীরে পঁচন ধরবে। বহু চিন্তা করে ডাক্তারের পরামর্শে কেটে ফেলা হলো ইরফানের ডান পায়ের ৮০ ভাগ অংশ। পা কাটার সাথে সাথে প্রতিভাবান এক খেলোয়াড়ের স্বপ্নের কবর হয়। একটি সড়ক দুর্ঘটনা ইরফানের সব স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্খা নিমিশেই শেষ করে দেয়। নেমে আসে জীবনে হতাশা আর অন্ধকার। অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ জীবনের দিকে পা বাড়ায় ইরফানের জীবন।

বাবার সব স্বপ্ন ও আশা ছিল ছেলেকে দেশে নামী একজন ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার। বাবার স্বপ্ন পুরণের পথেই এগিয়ে যাচ্ছিল ইরফান। সে স্বপ্ন ও আশা কেড়ে নেয় একটি সড়ক দুর্ঘটনা। আমাদের যেন নিয়তিই হয়ে দাঁড়িয়েছে, একশ্রেণির ড্রাইভার নামক দানবের কাছে স্বপ্ন ও আশাকে বন্ধক রাখতে হবে। তারা যখন খুশি, তখন তা কেড়ে নেবে। এমন ঘটনা কেবল ইরফানের জীবনেই নয়, বেপরোয়া চালকের আচরণে প্রতিদিনই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে রক্ত ঝরছে। কত আশা, কত স্বপ্ন নিমেষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিবারগুলোর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। যে বেপরোয়া চালকের কারণে পরিবারগুলোর আশা ও স্বপ্ন চুরমার হচ্ছে, তারা ঠিকই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

প্রতি বছরই সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ও হতাহতের পরিসংখ্যান বের হয়। মুলত এ পরিসংখ্যান মানুষের আশা ও স্বপ্ন হত্যারই পরিসংখ্যান। বছরে কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং কত মানুষের আশা সমাধিস্থল হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখলে শিউরে না উঠে পারা যায় না। স্বজনেরা হারাচ্ছে তাদের প্রিয়জনকে। কেউ বা মেনে নিচ্ছে ইরফানের মত পঙ্গুত্ববরণ।

এমন দুর্ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে কিছু দুর্ঘটনা সব দুর্ঘটনার ‘মুখ্য’হয়ে উঠে। এ নিয়ে কিছুদিন আলাপ-আলোচনা কিংবা সমালোচনা হয়, তারপর যেন থেমে যায়। এমন আরেকটি দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত চেতনা জাগ্রত হয় না। অথচ এই চলমান দুর্ঘটনা জাতীয় জীবনে দুর্যোগ হয়ে রয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই।

ইরফানের পরিবারে ছিলো বাবা-মার দুই মেয়ে, এক ছেলে। দুই মেয়ে বড় আর ছোট্ট ছেলেটি। দুই মেয়ে আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সুখের সংসার। সাজানো রাজত্বে বাবা মোঃ ইলিয়াস জাবেদ গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মা নার্গিস আক্তার গৃহিনী। মা-বাবার আদরের ছেলের জন্য বউ করে আনা হয় একই এলাকার শামসুল আলমের মেয়ে জান্নাতুল মাওয়াকে। আনন্দের সাথে তাদের সকলের বসবাস, কিন্তু সুখের সংসার বেশি দিন পেরোতেই পারেনি। বিয়ের চার মাসের মধ্যে হানা দেয় কালো-মেঘ। এক বেপরোয়া চালক হত্যা করে সাজানো রাজত্বের সকলের আশা ও স্বপ্ন।
পা হারানো ইরফান এখন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন উন্নত জাতের কবুতর আর মুরগী পালন। কোন রকমে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা। ৪ বছর যাবত অমানবিক কষ্ট করে কোন রকমে সংসারের হাল ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এরইমধ্যে তাদের কোলে আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে ছেলে মিরাজ হোসেন।

ইরফান দীর্ঘদিন যাবত ফুটবল নিয়ে মাঠে সরব থাকলেও বর্তমানে পঙ্গু হয়ে বাসায় বন্দি। মানবিক বিবেচনায় কোন ক্রীড়া সংস্থা ও সংগঠন সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেননি। কিছু মানুষ পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেও কেউ এখনো এগিয়ে আসেননি।

চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো খুবই ব্যথিত করেছে আমাদেরও। আমাদের জেলা ক্রীড়া সংস্থা বরাবর আবেদন করেছেন। আমরা অবশ্যই সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করব।

কালারপোল ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মোঃ আব্দুর রহিম বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। যখনি ইরফান একজন ভালো ফুটবলার হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন, তখনই সে দুর্ঘটনায় পতিত হলেন। আজ যদি তিনি খেলতে পারতেন অবশ্যই একজন ভালো খেলোয়াড় হতেন। ইরফানের এমন দুঃসময়ে সকলের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

কর্ণফুলী ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম হক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণকারী প্রতিভাবান খেলোয়াড় মোঃ ইরফান হোসেনের পাশে সকলের এগিয়ে আসা উচিত। জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি মুহুর্তে তিনি এক পা নিয়ে যুদ্ধ করছেন। আশা করি জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি নজরে নেবেন। আমরাও যতটা পারি পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করব।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x