ব্রেকিং নিউজ

আপডেট ৩৪ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড

ঢাকা শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১, ৯ মাঘ, ১৪২৭, শীতকাল, ৯ জমাদিউস সানি, ১৪৪২

বিজ্ঞাপন

নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে তেলের বাজার: চার মাসে দাম বেড়েছে ৫৬.২৫ শতাংশ

অনলাইন ডেস্ক

নিরাপদ নিউজ

করোনা মহামারির কারণে উৎপাদন কম হওয়ায় বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে তেলের বাজার। সেই প্রভাবের ঢেউ আছড়ে  পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। হু হু করে বেড়েই চলেছে এ নিত্য পণ্যের দাম। সাধারণ ক্রেতারা বেকায়দায়।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, গত চার মাসে বাংলাদেশের বাজরে গড়ে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে ৫৬.২৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা, এখন এই তেল বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা। একই অবস্থা পাম তেলের ক্ষেত্রেও। সেপ্টেম্বরে যেখানে প্রতি কেজি সুপার পাম তেল বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা দরে। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকা দরে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী দেশে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের তেল ব্যবসায়ীরা। তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে লিটারপ্রতি দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করাসহ ভোজ্য তেলে তিন স্তরের ভ্যাটের পরিবর্তে এক স্তরের ভ্যাট নির্ধারণের জন্য চিঠি দিয়েছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে। চলতি মাসের শেষে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক হবে বলে জানা গেছে।

শনিবার (০৯ জানুয়ারি) রাজধানীর সূত্রাপুর,  রায়সাহেব বাজার, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল ১২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১২৫ টাকায়। বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৫৮০ থেকে ৬২০ টাকায়। এক কেজি লুজ পাম অয়েল ৯৮ টাকা এবং সুপার পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায়।

গত সেপ্টেম্বর মাসেও প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই তেল বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকায়। অর্থাৎ গত চার মাসে প্রতি কেজি সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫ টাকা।

অন্যদিকে, খোলা পাম তেলের অবস্থাও একই রকম। গত সেপ্টেম্বরে খোলা সুপার পাম তেলে বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকায়। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায়। সেই হিসাবে গত চার মাসে সুপার পামের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা। আর গত চার মাসে সব ধরনের তেলের দাম বেড়েছে ৫৬ দশিমক ২৫ শতাংশ।

বর্তমানে পাইকারিতে মৌলভীবাজারে প্রতি মণ (৩৭.৩২কেজি) সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৪০০ টাকা। সে হিসেবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ১১৮ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল চার হাজার ২০০ টাকা মণ বা প্রতি কেজি ১১২ টাকা। সয়াবিনের মতো পাম তেলের দামও বেড়েছে। পাইকারিতে পাম সুপার বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৯০০ টাকা মণ, প্রতি কেজি ১০৪ টাকা। যা গত সপ্তাহে ছিল ৩৮০০ টাকা মণ, প্রতি কেজি ১০১ টাকা।

আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সপ্তাহের আমদানিমূল্যের সঙ্গে সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্স, পরিশোধন ও বিপণন খরচ যোগ করলে বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিন বোতলজাতকরণ পর্যন্ত খরচ পড়ে ১৩২ টাকা। বাজারে এখন যে দামে ভোজ্যতেল (সয়াবিন ও পাম) বিক্রি হচ্ছে, গত সপ্তাহের আমদানিমূল্য ধরে বিক্রি করলে খুচরা মূল্য আরও বেশি হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক বাজারের এ ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোয় ভোজ্য তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা পরিশোধনকারীদের। এজন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বিবেচনা করে সম্প্রতি প্রতি লিটার ভোজ্য তেলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণসহ তিন স্তরের ভ্যাট থেকে এক স্তরে নামিয়ে আনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু ওই চিঠির পর আন্তর্জাতিক বাজারে আরও কয়েক দফা বেড়েছে পণ্যটির দাম।

এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে দেশের বাজারেও দাম বেড়েছে। তবে এর সঙ্গে শুধু আন্তর্জাতিক বাজার নয়, আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় একটু সমস্যা রয়েছে। যেমন মিলগেট থেকে খোলা তেল খুচরা বাজারে আসতে অনেকগুলো হাত বদল হয়। এতে করে দামে কিছুটা বাড়ে। এ বিষয়ে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসবো।

তিনি বলেন, তেলটা সম্পূর্ণ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আমরা ভ্যাটের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বলেছি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। তারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে। আমাদের রাজস্বও লাগবে, আবার ভোক্তাদের কম দামেও পণ্য দিতে হবে। আশা করছি তেলের দাম কমে যাবে।

সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বিশ্বব্যাপী চাহিদার তুলনায় পণ্যটির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম হুহু করে বাড়ছে। ৭০০ ডলারের সোয়াবিন তেল এখন ১২২০ ডলার। আর গত কয়েক মাসে তেলের দাম ৫০০ ডলার বেড়েছে, পার মেট্রিকটনে ৪০ হাজার, পার কেজিতে ৪০ টাকা। সে হিসেবে আমাদের বাজারে দাম বৃদ্ধি পায়নি। সামনে আরও বাড়বে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলো চীন বিপুল পরিমাণ সয়াবিন কিনেছে। এছাড়া করোনাতো আছেই। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও আমেরিকায় তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এছাড়া ভ্যাট বেশি হওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের কাছে চাইলেও কম মূল্যে পণ্যটি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। তিন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। আমদানিতে ২০ শতাংশ, উৎপাদনে ১৫ শতাংশ এবং বিক্রয় পর্যায়ে ৫ শতাংশ করে মোট ৪০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। আমরা সেটাকে এক স্তরে ১৫ শতাংশে করার প্রস্তাব দিয়েছি। সরকার যদি এখানে ব্যবস্থা নিতে পারে তাহলে দামের লাগাম কিছুটা টেনে ধরা সম্ভব হবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশেও (ক্যাব) বলছে, ভোজ্যতেলের মতো একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে তিন স্তরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট যৌক্তিক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে করকাঠামো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তাহলে দামের রাশ কিছুটা টানা সম্ভব হতো। এতে ভোক্তারাও একটু স্বস্তি পেতো।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোস্তফা হায়দার বলেন, তেলের দাম দিন দিন বাড়ছে। কারণ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আমদানির বড় বাজার। এসব দেশে করোনার কারণে উৎপাদন কম। এছাড়া চীন এবার ব্যাপক হারে তেল কিনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সরকারের নেই। সরকার যা পারে তা হলো ভ্যাট-ট্যাক্স কমিয়ে বাজারজাতকরণ খরচ কমাতে সহায়তা করা। ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে বাড়ছে সে অনুযায়ী সরকার মূল্য সমন্বয় না করলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে না।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এফএওর সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত দুই মাসে ব্যাপকভাবে বেড়েছে ভোজ্য তেলের দাম, ফলে সার্বিকভাবে খাদ্যপণ্যের এই বাজার ঊর্ধ্বমুখী। তিন কারণে বিশ্ববাজারে বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম। সরবরাহ ঘাটতি, রপ্তানি কর বৃদ্ধি ও চীনের বিপুল ক্রয়ের কারণে বিশ্ববাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়ছে। সয়াবিনের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ আর্জেন্টিনায় সরকারের সঙ্গে কৃষকদের দ্বন্দ্বে ধর্মঘট চলছে। এতে বন্দরের লজিস্টিকস সেবা বন্ধ হয়ে পড়ায় সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ রয়েছে। এমনকি এই ধর্মঘট ফেব্রুয়ারি পর্যন্তও চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সয়াবিন রপ্তানিতে কর বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশ করেছে আর্জেন্টিনা। এতে গত মঙ্গলবারও বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম ৩ শতাংশ বেড়ে হয় প্রতি বুশেল ১৩.৫৭ ডলার। এমনকি ওই দিন সর্বোচ্চ দাম ১৩.৭৩ ডলার পর্যন্তও ওঠে, যা ২০১৪ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ দাম।

এদিকে বিশ্ববাজার থেকে চীন বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ক্রয় করলেও ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে খরায় উৎপাদন কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় অভ্যন্তরীণ বাজার ঠিক রাখতে ব্রাজিল ও আমেরিকা বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমিয়েছে। সয়াবিনের নতুন মৌসুম শুরু হবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে। রপ্তানিকারক দেশগুলো নতুন ফসল পাওয়ার আগ পর্যন্ত সরবরাহ বাড়াবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এফএও আরো জানায়, পাম তেলের বড় রপ্তানিকারক দেশগুলো থেকে সরবরাহ কমেছে। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া বিপুল রপ্তানি শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানিতে শুল্ক প্রতি টন ৫৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে মান ভেদে ২৫৫ ডলার পর্যন্ত করেছে।

অন্যদিকে প্রতিকূল আবহাওয়া ও শ্রম সংকটের কারণে পাম তেল উৎপাদন কমিয়েছে মালয়েশিয়া। এমনকি ইন্দোনেশিয়ার পথ ধরে এই দেশটি এ বছর পাম তেল রপ্তানিতে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানায় মালয়েশিয়ার পাম অয়েল বোর্ড। দেশটির পাম তেল রপ্তানি কর ৬.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ শতাংশ হবে। এতে প্রতি টন রপ্তানিতে শুল্ক পড়বে ৬৮ ডলার। ফলে বিশ্ববাজারে আরো বাড়তে পারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম।

উল্লেখ্য, দেশে বছরে প্রায় ২৮ লাখ টন পরিশোধিত ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া দেশে প্রতি বছর আরও প্রায় দুই লাখ টন অভোজ্য তেল আমদানি করা হয়, যা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হয়। ২৮ লাখ টন ভোজ্য তেলের মধ্যে ৯০ শতাংশই আমদানি হয়। চাহিদার মোট ভোজ্য তেলের মধ্যে সয়াবিন তেলের অংশ হচ্ছে ৪০ শতাংশের মতো। পাম তেলের অংশ হচ্ছে ৫২ শতাংশের মতো এবং বাকিটা সরিষা ও অন্যান্য তেল।

কোম্পানিগুলো অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করে। তারপর তেলের একটি অংশ বোতলে ভরে বাজারজাত করে। বাকিটা খোলা তেল হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x