চামড়ার বাজারে এবারও ধস, সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম কেউ মানেনি

- Advertisements -

গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়া বাজারে ধস নেমেছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া দর মানেননি ট্যানারি মালিক ও বড় আড়ৎদাররা। চামড়ার বাজারগুলো থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কমে কাঁচা চামড়া কিনেছেন তাঁরা। ফলে বিভিন্নস্থান থেকে সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে এসে মৌসুমি ও ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টরাও পর্যাপ্ত দাম পাননি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারও দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে চামড়ার বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কমে। গত বছরের চেয়ে প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। এছাড়া এবারও ছাগলের চামড়া কেনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রির জন্য মূলত ট্যানারি ও বড় আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া কিনছেন এবং বিক্রি করছেন।

রাজধানীর বৃহত্ত্বম চামড়ার বাজার লালবাগের পোস্তার আড়ৎগুলো ঘুরে কাঁচা চামড়ার দর পতনের চিত্র পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সেখানে দেখা গেছে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে এলেও সরকার নির্ধারিত মূল্য পাননি। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার দাম ঘোষণা করলেও বাজার তদারকিতে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন।

চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন মিলিয়ে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে সরকারি নির্ধারিত দাম অনুযায়ী বাজারে যে দর থাকার কথা, বাস্তবে তার অর্ধেকেরও কমে বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ চামড়া।

পোস্তা বাজারে ২০ পিস গরুর চামড়া বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ী আকমল হোসেন। তিনি প্রতি পিস চামড়ার দাম ১ হাজার টাকা চাইলে আড়ৎ মালিকরা ৬৫০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। পরে তিনি দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা করলেও ক্রেতা মেলেনি।

Advertisements

আকমল বলেন, গত বছর এই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার সবাই ৬০০-৬৫০ টাকার বেশি বলতে চাচ্ছে না। সরকার দাম বাড়ালেও বাজারে তো তার কোনো প্রভাব নেই।

রাজধানীর অন্যান্য চামড়ার বাজারগুলোতেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, মগবাজার, মুগদা, ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব ও শেওড়াপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার ঘোষিত দরে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে বড় আকারের চামড়ার সম্ভাব্য মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সেই দাম পাননি তারা। ট্যানারি থেকে যে দর নির্ধারণ করা হয়, তার ভিত্তিতেই তারা মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনাবেচা করেন। এতে শেষপর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েন কোরবানিদাতা ব্যক্তি, মসজিদ-মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো।

তবে তাঁরা বলছেন, এবার কোরবানির সংখ্যা কিছুটা কম হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই ট্যানারি মালিকরা এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় কম। তাছাড়া চামড়ার বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্বচ্ছতা কাজ করছে। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

জানতে চাইলে পোস্তা এলাকায় কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি টিপু সুলতান দাবি করেছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের মধ্যেই বেশির ভাগ বেচাকেনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চোখের দেখায় কাঁচা চামড়া কিনি। এ জন্য দামে ৫০ টাকা কমবেশি হতে পারে।’

তবে ট্যানারি মালিকরা কম দামে চামড়া কেনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহর দাবি, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেনি, বরং ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। তিনি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছেন।

তিনি বলেন, রাজধানীর কাঁচা চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে অনেক ট্যানারি এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে চামড়া কিনছেন। তবে বাজার পুরোপুরি জমতে সময় লাগে। ঈদের দিন দুপুর পর্যন্ত কেনাবেচা জমে না ওঠায় কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি হয়ে থাকতে পারে। বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর দাম আরও বাড়তে পারে।

Advertisements

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর পোস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর চামড়ার বাজার কিছুটা জমে উঠলেও দামে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। বড় আকারের চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

এদিকে, গরুর মতো ছাগলের চামড়ার বাজারেও ধস নামে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পিস ছাগলের চামড়া মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো দাম ছাড়াই চামড়া নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, ছাগলের চামড়া এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ চামড়া বিক্রি করে সংরক্ষণ খরচও তুলতে পারছেন না তারা। এই কারণে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করেও লোকসানের মুখে পড়েছেন।

চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতার বড় ভুক্তভোগী দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোও। কারণ অনেক মাদরাসার খরচের বড় একটা অংশ আসে প্রতিবছর সংগৃহীত কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি থেকে। সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে থাকে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা। অনেক কোরবানিদাতাই স্বেচ্ছায় তাদের পশুর চামড়া এসব প্রতিষ্ঠানে দান করেন। এই চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়েই মূলত লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে। দাম কম থাকায় মাদরাসাগুলোর মধ্যেও চামড়া সংগ্রহে কিছুটা অনীহা দেখা যাচ্ছে। এ বছরও পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় আগামী দিনগুলোতে তারা প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খাবেন বলে ধারণা করছেন।

খিলগাঁওয়ের নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহবুবুল্লাহ বলেন, প্রতি বছর পরিকল্পিতভাবে চামড়া খাতকে ধ্বংস করা হচ্ছে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/jpml
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন