নিকুঞ্জ ২-এ খেলার মাঠ বাঁচানোর লড়াইয়ে জিতল সাধারণ মানুষ

- Advertisements -

বিশেষ প্রতিনিধি: ​রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ ২ এলাকার একমাত্র খেলার মাঠটি দখল করে বৈশাখী মেলা আয়োজনের যে হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, প্রবল জনমত ও প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে তা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে এই অনিয়মের বিষয়ে অব্যাহত সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিকুঞ্জ ২ কল্যাণ সমিতি অবশেষে তাদের ইস্যু করা সেই বিতর্কিত ও ‘কথিত’ অনুমতিপত্রটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। তবে সমিতির এই পিছুটান ছিল মূলত আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, কারণ তাদের এই বাতিলের সিদ্ধান্তের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগেই স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা প্রাঙ্গণে অভিযান চালিয়ে সকল কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন রাতের মধ্যেই মাঠের সকল অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে মাঠটি সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া হয়।

সমাজকল্যাণে নিবন্ধিত একটি আবাসিক কল্যাণ সমিতি কীভাবে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা ডিএমপির অনুমতি ছাড়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত খেলার মাঠ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দিতে পারে, তা নিয়ে এখন জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে এলাকার শিশুদের একমাত্র খেলাধুলার জায়গাটি কারো সাথে কোনো প্রকার আলোচনা বা জনমত যাচাই না করে এভাবে ব্যক্তিস্বার্থে ইজারা দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

​ঘটনার গভীরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিকুঞ্জ ২ কল্যাণ সমিতিতে বর্তমানে সাধারণ বাসিন্দাদের দ্বারা নির্বাচিত কোনো নিয়মিত কমিটি নেই। সমিতিটি বর্তমানে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক ইনসান আলীর নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একজন সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে প্রশাসক কীভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে একটি খেলার মাঠ মেলা করার জন্য বরাদ্দ দিলেন, তা নিয়ে খোদ সমিতির সদস্যদের মধ্যেই তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

প্রশাসক ইনসান আলী স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে দেখা গেছে, কুদ্দুস নামে এক ব্যক্তিকে মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যার সাথে নিকুঞ্জ এলাকার কোনো দূরতম সম্পর্ক নেই। ওই ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুরের এরশাদনগরে দেখানো হয়েছে। একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে কোন মানদণ্ডে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকার মাঠ বরাদ্দ দেওয়া হলো, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এর পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন এবং একটি প্রভাবশালী মহলের গভীর যোগসাজশ ছিল।

​সরেজমিনে তদন্তে এবং এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে এই মেলা আয়োজনের নেপথ্যে থাকা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বৈশাখী মেলার নামে এই মাঠ দখলের পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করছিলেন খিলক্ষেত থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ জহির উদ্দিন বাবু ওরফে জহির বাবু, থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুরাদ মজুমদার এবং ৯৬ নং ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব মোঃ আলম মোড়ল ওরফে হোটেল মেসিআর মোড়ল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকেল পর্যন্ত এই চক্রের কয়েক ডজন অনুসারী মাঠে অবস্থান নিয়ে মেলা আয়োজনের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন। তারা শিফটিং ডিউটির মতো করে মাঠে পাহারা বসিয়েছিলেন যেন সাধারণ মানুষ বা স্থানীয় তরুণরা মাঠে প্রবেশ করে বাধা দিতে না পারে। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার এই অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তৎপরতায় ব্যর্থ হয়েছে।

​সোমবার বিকেলে সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের উত্তর পাশে থাকা ফুডকোর্টের সামান্য কিছু অংশ ছাড়া বাকি পুরো মাঠ এখন স্থাপনামুক্ত। সম্পূর্ণ খালি মাঠে এলাকার তরুণদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটবল খেলতে দেখা গেছে, যা গত কয়েকদিন ধরে কার্যত অসম্ভব ছিল। মাঠে খেলতে আসা তরুণ ইশতিয়াক তার অনুভূতি ব্যক্ত করে জানান যে, প্রশাসন বৈশাখী মেলা বন্ধ করে দেওয়ায় তারা এবং তাদের পরিবার অত্যন্ত স্বস্তি বোধ করছেন। তারা চান খেলার মাঠ যেন সবসময় খেলার জন্যই উন্মুক্ত থাকে এবং ভবিষ্যতে কোনো অজুহাতেই যেন এখানে বাণিজ্য বা দখলের মহোৎসব না চলে।

এ বিষয়ে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, জনস্বার্থ ক্ষুন্ন করে এবং খেলার মাঠ বন্ধ করে কোনো ধরনের মেলা বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। নিকুঞ্জ ২ খেলার মাঠে মেলার জন্য কোনো যথাযথ প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল না বিধায় পুলিশ আইনগতভাবেই তা বন্ধ করে দিয়েছে।

এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, জনস্বার্থের বিপরীতে গিয়ে কোনো সিন্ডিকেটই মাঠ দখল করে টিকে থাকতে পারবে না। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি তুলেছেন, ভবিষ্যতে যেন অ্যাডহক কমিটির মতো অস্থায়ী কর্তৃপক্ষ এ ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/nhid
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন