English

30 C
Dhaka
রবিবার, জুলাই ২১, ২০২৪
- Advertisement -

কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

- Advertisements -
Advertisements
Advertisements

অভিনেতা, চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিচালক, গীতিকার, কাহিনী-চিত্রনাট্য-সংলাপকার, উপন্যাসিক, গল্পকার- নাট্যকার আমজাদ হোসেন-এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর, ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। প্রয়াত এই গুণী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই । তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
আমজাদ হোসেন ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট, জামালপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নুরউদ্দিন সরকার ছিলেন ব্যবসায়ী, মাতা পরিমাতুননেসা। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে, সবার বড় আমজাদ হোসেন। তিনি জামালপুর জেলা স্কুল থেকে, ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে, মেট্রিক পাস করে, আশেদ মাহমুদ কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তিতে ঢাকায় এসে, ঢাকা সিটি কলেজে (নাইট শিফট) ভর্তি হন, এখান থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন আমজাদ হোসেন। ছড়া লিখে সাহিত্যের অঙ্গণে তাঁর প্রথম প্রবেশ। লেখালেখির মাধ্যমেই তাঁর সৃজনশীল কর্মজীবনের শুরু। তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকায়। ছোটদের জন্যে তিনি লিখেছেন বহু গল্প, ছড়া এবং উপন্যাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস ও গল্প লিখেছেন, বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী এবং ইতিহাসভিত্তিক লেখাও লিখেছেন। তাঁর লিখা উপন্যাসসমূহ- ধ্রুপদী এখন ট্রেনে, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা, আমি এবং কয়েকটি পোস্টার, নিরক্ষর স্বর্গে, অস্থির পাখিরা, ফুল বাতাসী, রাম রহিম, আগুনে অলঙ্কার, ঝরা ফুল, শেষ রজনী, মাধবীর মাধব, মাধবী ও হিমানী, মাধবী সংবাদ, যুদ্ধে যাবো, অবেলায় অসময়, উত্তরকাল, যুদ্ধযাত্রার রাত্রি প্রভৃতি।
তিনি আরো যেসব গ্রন্থ লিখেছেন- মাওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু জীবন ও রাজনীতি, মানবেন্দ্রনাথ রায় জীবন ও রাজনীতি, শ্রী হেমচন্দ্র চক্রবর্তী।
তাঁর লিখা কিশোর উপন্যাস- জন্মদিনের ক্যামেরা, যাদুর পায়রা, ভূতের রাণী হিমানী, সাত ভূতের রাজনীতি, শীতের রাজা উহু কুহু, টুকটুক, রঙিন ছড়া কৃষ্ণচুড়া।
গল্পগ্রন্থ- পরী নামা জোছনায় বৃষ্টি, কৃষ্ণলীলা। রচনাসমগ্র- মুক্তিযুদ্ধের রচনাসমগ্র, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত কিশোর গল্প।
আমজাদ হোসেনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস সমগ্র-১, নির্বাচিত গল্পসমগ্র, কিশোর গল্পসমগ্র ইত্যাদি ।
আমজাদ হোসেন ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত, মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। তাঁর রচিত নাটক অবলম্বনে ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে, পরিচালক সালাহ্‌উদ্দিন নির্মাণ করেন ‘ধারাপাত’ চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন আমজাদ হোসেন। তাঁর অভিনীত উল্যেখযোগ্য অন্যান্য ছবিসমূহ- হারানো দিন, বেহুলা, দুই ভাই, আনোয়ারা, সংসার, পিতা পূত্র, জীবন থেকে নেয়া’সহ বেশ কিছু ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। একাধিক আলোচিত নাটকেও অভিনয় করছেন তিনি।
এক সময় তিনি পরিচালক জহির রায়হানের ইউনিটে যুক্ত হয়ে একাধিক কালজয়ী চলচ্চিত্রে কাজ করেন। এরপর আমজাদ হোসেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় জড়িত হয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন এবং খ্যাতি অর্জন করেন।
তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুন নিয়ে খেলা’ (যৌথ) মুক্তিপায় ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। আমজাদ হোসেন পরিচালিত অন্যান্য ছবি- জুলেখা, দুই ভাই (যৌথ), বাল্যবন্ধু, পিতা পুত্র, নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, দুই পয়সার আলতা, জন্ম থেকে জ্বলছি, ভাত দে, সখিনার যুদ্ধ, হীরা মতি, গোলাপী এখন ঢাকায়, আদরের সন্তান, সুন্দরী বধূ, প্রাণের মানুষ, কাল সকালে, গোলাপী এখন বিলাতে প্রভৃতি ।
এছাড়াও তিনি ‘বাংলার মুখ’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ছবিটির শ্যুটিং সম্পন্ন হওয়ার পর, এফডিসি থেকে, তাঁর পুরো নেগেটিভ গায়েব হয়ে যায়।
এছাড়াও তিনি একাধিক আলোচিত ও জনপ্রিয় টিভিনাটক নির্মাণ করেছেন। একসময় ঈদের নাটক মানেই ছিল আমজাদ হোসেনের ‘জব্বার আলী’ (সিরিজ নাটক)।
আমজাদ হোসেন নিজের ছবি ছাড়াও, অন্যান্য নির্মাতাদের ছবিতে কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও গান লিখেছেন এবং পুরস্কারও পেয়েছেন। অন্য পরিচালকদের ছবিতে তাঁর চলচ্চিত্রকর্মগুলো হলো- বেহুলা, আনোয়ারা, জীবন থেকে নেয়া (সংলাপ)। সংসার, মানুষ অমানুষ, আবার তোরা মানুষ হ, সুজন সখী (কাহিনী)। রাই বিনোদিনী (গান) ।
আমজাদ হোসেন গীতিকার হিসেবেও পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, ও খ্যাতি, জনপ্রিয় কালজয়ী অনেক গানের স্রষ্টা তিনি । তাঁর লেখা অসংখ্য জনপ্রিয় কালজয়ী গান আছে, যেমন- হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ…, একবার যদি কেউ ভালোবাসতো…, বাবা বলে গেলো আর কোনো দিন গান করো না…, কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিলো না…, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো…, এমনও তো প্রেম হয় চোখের জলে কথা কয়…, আমি আছি থাকব ভালোবেসে মরব…, বন্ধু তিন দিন তো বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না.., নানিগো নানি…, ইত্যাদি ।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ব্যতিক্রমধর্মী এই চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁর কর্মজীবনে ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ৬টি বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে, দুইবার অগ্রণী শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। আমজাদ হোসেন- ফজলুল হক স্মৃতি কমিটি থেকে ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার- ২০০৯’সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন।
ব্যক্তিজীবনে আমজাদ হোসেন দুইবার বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে হয়, বরিশালের মেয়ে, রওশন আরার সাথে। প্রথম সংসারে তাঁর তিন ছেলে- দোদুল, কল্লল ও মৃদুল। দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন, তৎকালীন চিত্রনায়িকা সঞ্চিতা (সুরাইয়া আক্তার চৌধুরী)কে। এই সংসারে তাদের এক ছেলে এক মেয়ে- সোহেল আরমান, শায়লা শারমিন শুক্লা। তাঁর দুই পুত্র সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ও সোহেল আরমান, স্বনামধন্য অভিনেতা-পরিচালক ও নাট্যকার।
বহুমুখী এক প্রতিভার নাম আমজাদ হোসেন। সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের প্রায় সব শাখায় যাঁর দাপুটে বিচরণ ছিল। একাধারে ছড়াকার, গল্পকার, উপন্যাস রচয়িতা, কাহিনিকার, অভিনেতা,পরিচালক, প্রযোজক, গীতিকার। মেহনতি মানুষের জীবন-সংগ্রামের অন্যতম রূপকার তিনি। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র যেন একেকটি উপন্যাস।
তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র সিনেমাদর্শক কর্তৃক যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি চলচ্চিত্র সমালোচক কর্তৃক হয়েছে প্রসংশিত। তাঁর বেশীরভাগ ছবিই মানসম্পন্ন ও ব্যবসাসফল। একজন সৃজনশীল মেধাবী চলচ্চিকার হিসেবে আমজাদ হোসেন, জননন্দিত ও দেশবরেণ্য ব্যক্তি ।
অসাধারণ মেধাবী এই মানুষটি চলচ্চিত্রে যত গান লিখেছেন তারমধ্যে বেশিরভাগই শ্রোতা-দর্শক কর্তৃক সমাদৃত ও নন্দিত হয়েছে। হয়েছে জনপ্রিয়, রয়েছে কালজয়ীর তালিকায়। তাঁর গানের সুমধুর বাণী আজও মানুষের হৃদয়কে বিমোহিত করে, উদ্বেলিত করে।
চলচ্চিত্র সম্পর্কে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর, অর্জিত জ্ঞান ও শিক্ষা দিয়ে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে করে গেছেন সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে যে ক’জন কাজ করে গেছেন, আমজাদ হোসেন ছিলেন তাঁদের অন্যতম একজন।
বহুমাত্রিক প্রতিভাবান, দেশবরেণ্য, কিংবদন্তী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেন আজ অন্তলোকের বাসিন্দা। আসলে- আমজাদ হোসেনরা মরেন- না!  অনন্তকাল বেঁচে থাকেন তাদের সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে, কোটি মানুষের হৃদয়ে।

সাবস্ক্রাইব
Notify of
guest
0 মন্তব্য
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন