এ কে আজাদ: সৈয়দ লুৎফুল হক। চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক । চারুকলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। তিনি শিল্পকর্ম, চিত্রকলা গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক বইয়ের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। চিত্রকলার বাস্তবধর্মী শৈলীর জন্য সমাদৃত ছিলেন সর্বমহলে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন । শিল্প-সাহিত্যের নিবেদিত প্রাণ বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ লুৎফুল হক এর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায়, ৭২ বছর বয়সে, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুদিবস-এ প্রয়াত এই গুণীজনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
সৈয়দ লুৎফুল হক ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ, ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।
ঢাকা আর্টস কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট) থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে দৈনিক ইত্তেফাক দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন।
১৯৮৬ সালে তাঁর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী তৎকালীন শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ সময় তিনি দৈনিক বাংলা ও পাশাপাশি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করেন। সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল দি ইন্ডিপেনডেন্ট। এছাড়া, মর্নিং নিউজ, পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা, দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্টে শিল্প সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৩ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন।
সংবাদপত্রে কাজ করার কারণে নিয়মিত না হলেও সময় পেলেই ছবি আঁকার চর্চাটি অব্যাহত রেখেছেন।
সৈয়দ লুৎফুল হক শুধু ছবিই আঁকেননি, কাঠ মেটালের ম্যুরাল, টেরাকোটা ও মোজাইক ম্যুরাল নির্মাণসহ বইয়ের প্রচ্ছদ, নাটক ও সিনেমার অসংখ্য ডিজাইন অংকন করেছেন। যমুনা মাল্টিপারপাস ব্রিজের ডিজাইন কনসালট্যান্ট ছিলেন তিনি।
নেদারল্যান্ডস সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রাফিক ডিজাইন, ফটোগ্রাফি ও ম্যানেজমেন্টের ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। টেক ইন্টারন্যাশনাল-এর মাধ্যমে লিডারশিপ অন সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট, প্রফিটেবল নেগোসিয়েশন ও সুপারভাইজরি ম্যানেজমেন্টের উপর আন্তর্জাতিক সনদ লাভ করেন। সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাগুলোর ডিজাইন তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিলো। যেমন: ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড হেলথ ইত্যাদি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলির নকশা সৈয়দ লুৎফুল হকের করা। তিনি নিজেও একজন সাহিত্যিকও বটে। লিখেছেন বেশকয়েকটি বই। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে- সংবাদপত্রের ডিজাইন, দশ দিগন্তের দশ বাসিন্দা, চিত্রকলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, হাজার বছরের ঢাকার চিত্রকলা, ঢাকাই মসলিন, বিস্ময়কর আরব চিত্রকলা এবং ছড়ার বই ‘কত কথা কত মজা’ উল্লেখযোগ্য।
তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায়, যারমধ্যে ‘মহুয়া মলুয়ার দেশে’ ও ‘চিরায়ত চিত্রশিল্পী’ অন্যতম।
এ ছাড়াও তিনি বাংলা বর্ণমালার গ্রেডিং নিয়ে কাজ করেছেন।
সৈয়দ লুৎফুল হক চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। গোলাপী এখন ট্রেনে, সূর্যদীঘল বাড়ি, সুন্দরী, কসাই, সখিনার যুদ্ধ, ভাতদে ও শুভদাসহ বেশকিছু চলচ্চিত্রের পোস্টার, ফটোসেট ও প্রেস লে আউট ডিজাইন করেছেন তিনি।
সৈয়দ লুৎফুল হক তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য- শিল্পাচার্য জয়নুল স্বর্ণপদক, অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, নীপা পদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব লেখক সম্মাননা পদক অন্যতম।
সৈয়দ লুৎফুল হক ‘সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা’ গঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় প্রেসক্লাব এর সদস্য ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস)’র সদস্য।
সৈয়দ লুৎফুল হক। একজন সাংবাদিক, অংকন শিল্পী, লেখক, গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। বহুমাত্রিক প্রতিভায় ভাস্বর এক গুণী ব্যক্তিত্ব। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের নিবেদিত প্রাণ সৈয়দ লুৎফুল হক রচিত গবেষণাধর্মী গ্রন্থগুলো নতুন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য চিরকালীণ শিক্ষনীয় হয়ে থাকবে। এবং বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
