এ কে আজাদ: অঞ্জনা। নৃত্যশিল্পী। চিত্রনায়িকা। একজন প্রতিভাময়ী নৃত্যশিল্পী হিসেবে ছোট বেলাতেই চমক দেখিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় এক অনুষ্ঠানে নাচ দেখে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান খুশী হয়ে শিশু অঞ্জনাকে পুরস্কৃত করেছিলেন। বড় হয়ে তিনি এ দেশের ধ্রুপদ নৃত্যের এক অবিস্মরণীয় শিল্পী হয়ে উঠেন ।
বাংলাদেশের শীর্ষ নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একজন গুনী নৃত্যশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন দেশেবিদেশে। পুরস্কৃত হন জাতীয় পর্যায়ে।
এক সময় তিনি চলচ্চিত্রে আসেন নায়িকা হয়ে। চলচ্চিত্রেও তাঁর সফলতার কমতি নেই। একেরপর এক খ্যাতিমান সব চলচ্চিত্রকারদের সাথে কাজ করেন। নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন বিখ্যাত সব নায়কদের বিপরীতে।
তাঁর অভিনীত বেশীরভাগ ছবিই হয়েছে ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয়। এই প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অঞ্জনার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি, ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। প্রয়াণ দিবসে এই গুণী শিল্পীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
অঞ্জনা ১৯৫৬ সালের ২৭ জুন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকার, ঢাকা ব্যাংক কোয়ার্টারে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস চাঁদপুরে। তাঁরা দুই বোন এক ভাই। অত্যন্ত ছোটবেলা থেকেই নাচতে পছন্দ করতেন শিশু অঞ্জনা। মাত্র ৩/৪ বছর বয়সেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচতেন।
নৃত্যের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে তাঁর বাবা-মা তাঁকে নৃত্য শিখতে ভারতে পাঠান। সেখানে তিনি ওস্তাদ বাবুরাজ হীরালালের অধীনে নাচের তালিম নেন এবং কত্থক নৃত্য শিখেন। তখনকার সময়ে বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে তিনি
নৃত্য পরিবেশন করতেন। দেশী-বিদেশী নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। জাতীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায় তিনি একাধিকবার শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পীর পুরস্কার লাভ করেন।
তিন তিনবার জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি।
সেই সময়ে নৃত্যশিল্পী হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে থাকা অঞ্জনা চলচ্চিত্রে নায়িকা হয়ে আসেন, নায়ক-প্রযোজক সোহেল রানার হাত ধরে। নিজের প্রযোজিত ‘দস্যুবনহুর’ চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে সুযোগ করে দেন সোহেল রানা। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দস্যুবনহুর’ ছবিটি পরিচালনা করেন সারথী (শামসুদ্দিন টগর)। রহস্য ভিত্তিক এই ছবিতে অঞ্জনার বিপরীতে নায়ক ছিলেন সোহেল রানা।
অঞ্জনা অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহ- সেতু, অশিক্ষিত, জিঞ্জীর, আশার আলো, সুখের সংসার, যাদু নগর, সুখে থাকো, সানাই, বৌরানী, শাহী কানুন, বাগদাদের চোর, গাংচিল, আলাদিন আলিবাবা সিন্দাবাদ, মাসুম, সানাই, ঈদ মোবার, নান্টু ঘটক, রজনীগন্ধা, অন্ধবধূ, রাজবাড়ী, হিম্মতওয়ালী, শক্তি, পথে হলো দেখা, প্রেমিক, পরীস্থান, সুখদুঃখ, স্বার্থপর, শেষ বিচার, গুনাই বিবি, নূরী, বিচারপতি, বিষকন্যার প্রেম, ডাকু ও দরবেশ, পরিণীতা, বৌ কথা কও, অভিযান, নেপালী মেয়ে, রাখে আল্লাহ মারেকে, একইরাস্তা, বিধাতা, রাম রহিম জন, অঙ্কুর, জবরদস্ত, জিদ্দী, আশীর্বাদ, শাহীকানুন, বাপের বেটা, বিক্রম, আকাশপরি, রাজার রাজা, বিধিলিপি, দিদার, আনারকলি, অগ্নীপুরুষ, টার্গেট, মহারাজ, আশার প্রদিপ, প্রতিরোধ, চোখের মনি, ঈমানদার, অংশীদার, সুখ, দোযখ, সুপারস্টার, আপোষ, নাগিনা, মহান, হুশিয়ার, গ্রেফতার, ভাইজান, বিস্ফোরণ, প্রায়শ্চিত্ত, প্রতিক্ষা, দেশ বিদেশ, হুংকার, উচিৎ শিক্ষা, হাঙ্গামা, ইত্যাদি।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, নেপাল, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকাসহ বেশকয়েকটি দেশের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হন। বাংলা চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি আরও ৯টি দেশের ভাষায় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে জানা যায়।
তখনকার জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অঞ্জনা এক সময় ছিলেন সুপার মডেল। অনেক বিজ্ঞাপনচিত্রে তিনি কাজ করেছেন।
একদা বহুজাতিক কোম্পানি লাক্সের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। একজন জনপ্রিয় মডেল হিসেবেও তাঁর ছিল শীর্ষ স্থান।
অভিনয়ের পাশাপাশি অঞ্জনা চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। চলচ্চিত্র গুলো হলো- নেপালী মেয়ে, হিম্মতওয়ালী, দেশ বিদেশ, বাপের বেটা, রঙিন প্রাণ সজনী, শশুর বাড়ী, লালু সর্দার, রাজা রানি বাদশা, ডান্ডা মেরে ঠান্ডা, বন্ধু যখন শত্রু প্রভৃতি।
অঞ্জনা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। শেষ জীবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। তিনি বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।
এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র প্রতিষ্ঠাকালিন সদস্য ছিলেন তিনি।
অঞ্জনা তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। এরমধ্যে আছে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
এশিয়া মহাদেশীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায়- প্রথম স্থান (একবার), জাতীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায়- প্রথম স্থান (তিনবার)। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী: শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী- চলচ্চিত্র ‘পরিণীতা’ (১৯৮৬), বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী: শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী- চলচ্চিত্র ‘পরিণীতা’ (১৯৮৬)।
এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের থেকে বহু পুরস্কার ও সম্মননায় ভূষিত হয়েছেন।
একজন সরল-সহজ মানুষ হিসেবে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে সমাদৃত ছিলেন অঞ্জনা। এত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মানুষের সাথে মিশতেন কথা বলতেন যে, বুঝাই যেতনা তিনি একজন চিত্রনায়িকা। অথচ তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী। মানুষ হিসেবে ছিলেন এতটাই নিঃঅহংকার ও নির্মোহ । চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি, এই শিল্পের প্রতিটি মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালোবাসা ।
গুণী এই নৃত্যশিল্পী আমাদের চলচ্চিত্রের গানকে অনেক সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁর নৃত্যের ছন্দে। বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পে রেখে গেছেন বিশেষ অবদান ।
গুণী নৃত্যশিল্পী ও জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অঞ্জনা চিরদিন থাকবেন অমলিন আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির ভুবনে।
