হলিউডে অনেকেই আসেন, কিছুদিন আলো ছড়িয়ে মিলিয়ে যান। কিন্তু রোজ বার্ন সেই অভিনেত্রীদের একজন, যিনি ধীরে, স্থিরভাবে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ঘরানায় অভিনয় করে অবশেষে তিনি পৌঁছেছেন ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ যাত্রায়। পেয়েছেন অস্কার মনোনয়ন।
মার্তৃত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ইফ আই হ্যাড লেগস, আই উড কিক ইউ’-তে অভিনয়ের জন্য এবার তিনি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রীর বিভাগে মনোনীত হয়েছেন। এটি তার ক্যারিয়ারের প্রথম অস্কার মনোনয়ন। ছবিতে তিনি এমন এক মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি সন্তান জন্মের পর মানসিক টানাপোড়েন, পরিচয়ের সংকট এবং নিঃশব্দ ক্লান্তির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যান। রোজ বার্ন এই চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। সংলাপের চেয়ে বেশি কথা বলেছে তাঁর অভিব্যক্তি, নীরবতা ও দৃষ্টি। সমালোচকদের ভাষায়, এটি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিণত অভিনয়।
একাডেমি পুরস্কারে এই অভিনয়ের জন্য মনোনয়ন পাওয়া তাঁর দীর্ঘ অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি। তাইতো মনোনয়ন পাওয়ার পর এই অভিনেত্রী বলেন, ‘এই চরিত্রটি আমার জন্য খুব ব্যক্তিগত ছিল। একজন মায়ের ভেতরের ভাঙন, শক্তি আর অপরাধবোধ– সব একসঙ্গে বহন করা সহজ ছিল না। আমি কৃতজ্ঞ যে, দর্শক ও সমালোচকরা সেই সততাকে অনুভব করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়াটাই আমার জন্য বিশাল সম্মান। আমি সত্যিই অবাক এবং কৃতজ্ঞ।’
অস্কারের আগে রোজের বড় স্বীকৃতি এসেছে গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডে। এবারের ৭৫তম আসরে তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন একই সিনেমার জন্য। গোল্ডেন গ্লোব জয়ের পর তাঁর মন্তব্য ছিল আরও সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘মাতৃত্বকে আমরা প্রায়ই নিখুঁত ছবিতে দেখি। এই চলচ্চিত্র সেই ছবির আড়ালের সত্যিটা দেখিয়েছে। আমি শুধু চেষ্টা করেছি সত্যিটাকে সৎভাবে উপস্থাপন করতে।’
গোল্ডেন গ্লোব জয় সাধারণত অস্কারের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে অভিনয় বিভাগে। ফলে এখন অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, এই গতি বজায় থাকলে অস্কারের মঞ্চেও তাঁর নাম ঘোষিত হতে পারে। অস্কার জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পুরস্কার অবশ্যই সম্মানের, কিন্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ অভিনয় আর চরিত্রটিকে ঠিকঠাক মতো ধারণ করা। যদি এই চরিত্র কারও নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
সিনেমা সমালোচকদের মতে, এ বছর নারী অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। ফলে এবারের অস্কার দৌড়ে এগিয়ে আছেন অস্ট্রেলিয়ার এই মুখ।
রোজ বার্নের জন্ম ও বেড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ায়। সিডনিতে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রী প্রথমে থিয়েটার ও টেলিভিশনে কাজ করেন। ঐতিহাসিক সিনেমা ‘ট্রয়’-এ অভিনয়ের সুবাদে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। এরপর তাঁকে দেখা যায় বিভিন্ন ঘরানার সিনেমায়। অভিনয় করেন হরর গল্পের ‘২৮ উইকস লেটার’, সুপারহিরো ফ্র্যাঞ্চাইজির ‘এক্স-মেন: ফার্স্ট ক্লাস’– সবখানেই সমান স্বচ্ছন্দ তিনি। এই বহুমাত্রিক উপস্থিতিই তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি কখনও কেবল ‘গ্ল্যামারাস’ তারকা হয়ে থাকেননি; বরং চরিত্রকেন্দ্রিক অভিনয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে রোজ বার্ন দুই সন্তানের মা। মাতৃত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ে গভীরতা যোগ করেছে বলে মনে করেন অনেকেই। তবে তিনি বরাবরই ব্যক্তিজীবনকে আলোচনার বাইরে রাখেন।
সমালোচকদের প্রশংসা এবং দর্শক প্রতিক্রিয়া। সব মিলিয়ে রোজ বার্ন এখন অস্কারের দৌড়ে শক্ত অবস্থানে। হলিউড বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা, অভিনয়ের পরিপক্বতা এবং এ বছরের শক্তিশালী পারফরম্যান্স তাঁকে এগিয়ে রেখেছে। যদি তিনি অস্কার জিতে যান, তবে সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন হবে না; বরং প্রমাণ হবে যে দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়া শিল্পীর স্বীকৃতি একসময় আসেই।
রোজ বার্নের বিনোদন অঙ্গনের এই যাত্রা দেখায়, তারকাখ্যাতি নয়, শিল্পের গভীরতাই শেষ পর্যন্ত শিল্পীকে বড় করে তোলে। এখন অপেক্ষা শুধু সেই মুহূর্তের, যখন একাডেমির মঞ্চে তাঁর নাম উচ্চারিত হতে পারে বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী হিসেবে।
