এ কে আজাদ: প্রবীর মিত্র। অভিনেতা। শুরুরদিকে কয়েকটি চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করলেও তেমন একটা দর্শক চাহিদায় যেতে পারেননি। তবে অভিনয়ে ছিলেন খুবই সিরিয়াস। পরবর্তীতে বিভিন্ন চরিত্রে তিনি তাঁর অভিনয় ডাইমেনশন দেখিয়েছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সবসময় সব চরিত্রে’ই প্রতিভা ও মেধার উৎকর্ষতা দেখিয়েছেন অনায়াসে। প্রতিটা ছবিতে প্রতিটা চরিত্রে এতোটাই অনবদ্য অভিনয় উপহার দিয়েছেন যে, একজন জাত অভিনেতা হিসেবে বাংলা সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠেন অতি জনপ্রিয়-জননন্দিত।
এই প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পী বাংলা সিনেমায় তাঁর অভিনয় উৎকর্ষতার প্রভাব দেখিয়েছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে।
শক্তিমান ও সুঅভিনেতা প্রবীর মিত্রর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। প্রয়াত এই গুণী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই । তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
প্রবীর মিত্র ১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুমিল্লার চান্দিনায়, এক কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম প্রবীর কুমার মিত্র। পিতা গোপেন্দ্র নাথ মিত্র এবং মাতা অমিয়বালা মিত্র। বংশপরম্পরায় পুরনো ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা প্রবীর মিত্র।
ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা প্রবীর মিত্র প্রথম জীবনে সেন্ট গ্রেগরি থেকে পোগজ স্কুলে পড়াশোনা করেন। বিদ্যালয়ে পড়া সময়ে জীবনে প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে প্রহরীর চরিত্রে অভিনয় করেন।এরপর তিনি জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
ছোট বেলা থেকেই তাঁর ছিল অভিনয় এবং খেলাধুলার প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। ষাটের দশকে ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেটে খেলেছেন, ছিলেন ক্যাপ্টেনও । একই সময় তিনি ফায়ার সার্ভিসের হয়ে ফার্স্ট ডিভিশন হকি খেলেছেন। এছাড়া কামাল স্পোর্টিংয়ের হয়ে সেকেন্ড ডিভিশনে ফুটবলও খেলেছেন। পুরোদস্তর একজন স্পোর্টসম্যান প্রবীর মিত্র এক সময় হয়েযান প্রখ্যাত অভিনেতা।
একসময় পুরনো ঢাকার লালকুঠিতে শুরু হয় তাঁর নাট্যচর্চা। লালকুঠি থিয়েটার গ্রুপে অভিনয়ের মাধ্যমে পেশাদার অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন ৷
১৯৬৯ সালে, পরিচালক এইচ আকবরের ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় শুরু করেন প্রবীর মিত্র। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি। চলচ্চিত্রে প্রথম দিকে নায়ক হিসেবে অভিনয় শুরু করলেও পরবর্তীতে সহনায়ক এরপর চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
প্রবীর মিত্র অভিনীত চলচ্চিত্রসমূহ- জীবন তৃষ্ণা, মন নিয়ে খেলা, তিতাস একটি নদীর নাম, চাবুক, ঈশা খাঁ, চরিত্রহীন, চাষীর মেয়ে, আজও ভুলিনি, ভাড়াটে বাড়ী, লাভ ইন সিমলা, তীর ভাঙা ঢেউ, কেন এমন হয়, সেয়ানা, জালিয়াত, জয় পরাজয়, রক্তের ডাক, ফরিয়াদ, রক্তশপথ, অবসান, দাতা হাতেম তাই, অঙ্গার, মধুমিতা, মিন্টু আমার নাম, অশান্ত ঢেউ, অলঙ্কার, ফকির মজনু শাহ, অনুরাগ, ইশারা, তরুলতা, গায়ের ছেলে, প্রতিজ্ঞা, পুত্রবধূ, মৌচোর, ঝুমকা, সোনার তরী, সুখের সংসার, ঘরনী, বাঁধনহারা, কুদরত, সুখে থাকো, রেশমী চুড়ি, রঙীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, জন্ম থেকে জ্বলছি, কলমিলতা, উজান ভাটি, তাসের ঘর, লাল কাজল, কাজল লতা, দেবদাস, দুই পয়সার আলতা, বড় ভালো লোক ছিল, সীমার, প্রতিহিংসা, আরশী নগর, চ্যালেঞ্জ, জিপসি সর্দার, আশীর্বাদ, ফেরারী বসন্ত, আঁখি মিলন, নাজমা, মান অভিমান, নয়নের আলো, সুরুজ মিয়া, মীমাংসা, প্রেমিক, মানিক রতন, রসিয়া বন্ধু, সোনার সংসার, ঝিনুকমালা, গুনাই বিবি, তিন কন্যা, দহন, জবাব চাই, সাজানো বাগান, আপন ঘর, বিশ্বাস অবিশ্বাস, মিয়া ভাই, বেদের মেয়ে জোসনা, মুক্তির সংগ্রাম, স্বপ্নের ঠিকানা, আশা ভালোবাসা, দমকা, বাঁশীওয়ালা, চাওয়া থেকে পাওয়া, রঙিন প্রাণসজনী, রঙিন রংবাজ, আত্মসাৎ, বাঁচার লড়াই, মেয়ের অধিকার, মেঘলা আকাশ, জুয়াড়ী, বউ শ্বাশুড়ীর যুূ্দ্ধ, মেঘের পরে মেঘ, মেহের নিগার, লাল সবুজ, মাতৃত্ব, আয়না, পরম প্রিয়, মায়ের মর্যাদা, ও আমার ছেলে, সাজঘর, বাবা আমার বাবা, পৃথিবী টাকার গোলাম, এবাদত, কে আমি, ভাল হতে চাই, ইত্যাদি।
কখনো নায়ক, কখনো সহ-নায়ক, নায়কের বন্ধু, নায়কের ভাই, ব্যর্থ প্রেমিক, নবাব, রাজা-বাদশা, ডাকাত দলের সর্দার, আদর্শ পিতা, ফকির, পাগল ইত্যাদি সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র। সব চরিত্রেই অত্যন্ত সাবলীল সুন্দর অভিনয় করেছেন। একজন সুঅভিনেতা হিসেবে দর্শকনন্দিত ও জনপ্রিয় হয়েছেন। পাঁচ দশকের কর্মজীবনে তিনি পাঁচ শতাধিকেরও বেশী চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন।
এরমধ্যে ১৯৮২ সালে তিনি, মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ‘বড় ভাল লোক ছিল’ চলচ্চিত্রে ট্রাক চালক লোকমান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর এইচ আকবরের ‘সীমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। নায়ক-পরিচালক বুলবুল আহমেদের ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে দ্বিতীয়বার বাচসাস পুরস্কার পান।
২০১৮ সালে, তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। চলচ্চিত্র দর্শক পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা ‘দুই নয়নের আলো’ ছিবর জন্য, আর্টিস্ট জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ (এজেএফবি) পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা ও মিডিয়া জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (মিজাফ) তারকা পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন প্রবীর মিত্র।
ব্যক্তিগত জীবন প্রবীর মিত্র, ভালোবেসে বিয়ে করেন সেলিনা হোসেন অজন্তাকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে, বিয়ে করার সময় হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং এই ধর্মেই আছেন। তখন তার নাম রাখা হয় হাসান ইমাম। তাঁর স্ত্রী ২০০০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এই দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ে, তারা হলেন- মিঠুন মিত্র, ফেরদৌস পারভীন, সিফাত ইসলাম ও সামিউল ইসলাম। ছোট ছেলে সামিউল ২০১২ সালে ৭ মে মৃত্যুবরণ করেন।
আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে যাঁদের বদান্যতায় তাদের মধ্যে প্রবীর মিত্র অন্যতম। ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিলেন প্রবীর মিত্র। আর চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে বড় ভালো লোক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিলো সর্বমহলে। প্রবীর মিত্র একজন ভালো অভিনেতা একজন ভালো মানুষ। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে অতি পছন্দের প্রবীর দা। একজন খাটি মানুষ অত্যন্ত নিপাট ভদ্রলোক, কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পী প্রবীর মিত্র আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে ধ্রুব তারা হয়ে থাকবেন অনন্তকাল ধরে।
