এ কে আজাদ: মঞ্জু দত্ত। চিত্রনায়িকা-নৃত্যশিল্পী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে সহনায়িকা বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে যে কয়জন অভিনেত্রী তাদের মেধার স্ফুরণ ঘটিয়েছেন এবং জনপ্রিয় হয়েছিলেন, মঞ্জু দত্ত তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। যিনি তাঁর যোগ্যতার মাপকাঠিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্পে। যদিও একক নায়িকা হিসেবেও কাজ করেছেন, কিন্তু সেখানে সিনেমাদর্শকদের মন ভরাতে পারননি। তবে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে তখনকার সময়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, প্রশংসিত হয়েছেন, নিজের অভিনয় প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন। অভিনেত্রির পাশাপাশি মঞ্জু দত্ত একজন নৃত্যশিল্পীও। চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁর সুন্দর সাবলীল নৃত্যের ঝংকারে দর্শকদের নিয়ে যেতেন এক অন্যভুবনে।
তিনি একজন নৃত্য শিক্ষকও ছিলেন। চিত্রনায়িকা ও নৃত্যশিল্পী মঞ্জু দত্তের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০০০ সালের ১৮ জানুয়ারি, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, কলকাতা উডল্যান্ডস মাল্টি স্পেশালিটি হসপিটালে মৃত্যুবরন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর। প্রয়াত এই গুণী শিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি।
মঞ্জু দত্ত ১৯৫২ সালের ৪ জানুয়ারী, কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম থানার পশ্চিম অষ্টগ্রামের, রায়পাড়ায় এক কায়স্ত সাংস্কৃতিক পরিবারে, জন্মগ্রহণ করেন। অষ্টগ্রাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৬৭ সালে। এইচএসসি পাস করেন ১৯৬৯ সালে।
সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা মঞ্জু দত্ত ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির আবহে পরিপালিত হন। নাচ ও অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এক সময় অভিনয়ের সুযোগ পান চলচ্চিত্রে।
মঞ্জু দত্ত অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র, দিলীপ সোম পরিচালিত ‘সাত ভাই চম্পা’ মুক্তিপায় ১৯৬৮ সালে। এই চলচ্চিত্রে তিনি নায়িকা কবরীর বান্ধবীর চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
পারুলের সংসার, সাধু শয়তান, ওরা ১১ জন, রক্তাক্ত বাংলা, সংগ্রাম, আধাঁরে আলো, অবসান, কে আসল কে নকল, মানুষ অমানুষ, পরিহাস, মণিহার, মনের মানুষ, আলো ছায়া, বন্দিনী, সাগর ভাসা, মধুমিতা, টারজান অব বেঙ্গল, অচেনা অতিথি, ইশারা, জীবন সাথী, অনুরোধ, পরিহাস, সোনার খেলনা, ঈমান, পুত্রবধু, মাস্তান, গৃহলক্ষ্মী, ফেরারী বসন্ত, হাসি প্রভৃতি ।
মঞ্জু দত্ত নিজে চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। তাঁর প্রযোজিত চলচ্চিত্র ‘সোনার খেলনা’ ও ‘হাসি’।
ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুরে চিত্রনায়িকা মঞ্জু দত্ত বসবাস করতেন। তিনি ১৯৭০ সালে, শিশির চৌধুরীকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরে এই স্বামীর সাথে তাঁর ডিভোর্স হয়ে যায়।
১৯৭৮ সালে, মঞ্জু দত্ত দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন সিলেটের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জুবায়ের চৌধুরীকে। এই বিয়ের সময় তিনি ধর্মান্তরিত হন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর নাম হয় নূরজাহান। জানা যায় শেষপর্যন্ত এই বিয়েও টিকেনি।
মঞ্জু দত্তের একমাত্র পুত্র সন্তান রাজু চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন বলে জানাগেছে।
একজন অভিনেত্রী, একজন চিত্রপ্রযোজক, একজন নৃত্যশিল্পী, একজন নৃত্য শিক্ষক, একজন মঞ্জু দত্ত।
একজন প্রতিভাময়ী শিল্পী হয়েও একসময় তিনি ছিটকে পড়েন চলচ্চিত্র থেকে অভিনয় জগত থেকে। অভিনয়জীবনের মাঝপথেই থেমে যায় তাঁর ক্যারিয়ার।
অনেকেই মনে করেন ভাগ্য তাঁর সহায় হয়নি, সময় তাঁর অনুকুলে ছিল না। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সব ধরণের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েও, শেষ পর্যন্ত নিজের ক্যারিয়ার তাঁর যোগ্যতার সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হননি।
নিজের চলচ্চিত্রজীবনে ও ব্যক্তিজীবনে তেমন সফল না হলেও, অভিনয় গুণে আজও দর্শক হৃদয়ে সফলতার সাথে বিরাজমান আছেন অভিনেত্রী মঞ্জু দত্ত।
