সালাম মাহমুদ: টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটি অব বাংলাদেশ (ট্রাব)’র উদ্যোগে ৩৬তম ট্রাব বিজনেস, সিএসআর এন্ড কালচারাল অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী বশির আহমেদকে মরনোত্তর সম্মাননা, বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী ও বরেণ্য জাদুশিল্পী জুয়েল আইচকে আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হবে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাজধাননীর শাহবাগ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রিস্টাল বলরুমে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অর্থ, শিল্প, বাণিজ্য, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সঙ্গীত ও সাংবাদিকতা বিভাগে শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে ট্রাব অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ প্রদান ও জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে।
প্রয়াত বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী বশির আহমেদ ১৯৩৯ সালের ১৯ নভেম্বর কলকাতার খিদিরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নাসির আহমেদ। দিল্লির এক পরিবারের সন্তান বশির আহমেদ কলকাতায় ওস্তাদ বেলায়েত হোসেনের কাছ থেকে সঙ্গীত শেখার পর মুম্বাইয়ে চলে যান। সেখানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ’র কাছে তালিম নেন।
১৯৬৪ সালে সপরিবারে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার আগেই উর্দু চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করে বশির আহমেদ। চলচ্চিত্রে ‘যব তোম একেলে হোগে হাম ইয়াদ আয়েঙ্গে’ গানটি পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তার কণ্ঠস্বর ছিল মাধুর্যে ভরা। রাগ সঙ্গীতেও দখল ছিল তার। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খানের কাছে তালিম নেন তিনি। তালাশ চলচ্চিত্রে বিখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদের সঙ্গে কাজ করেন। ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল, শনিবার মোহাম্মদপুরে নিজের বাসায় তিনি মারা যান। কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি ছবিতে গানের জন্য ২০০৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ গায়ক) এবং ২০০৫ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
সৈয়দ আব্দুল হাদী ১৯৪০ সালের ১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে উঠেছেন আগরতলা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কলকাতায়। তবে তার কলেজ জীবন কেটেছে রংপুর আর ঢাকায়। তার পিতার নাম সৈয়দ আবদুল হাই। তার বাবা ছিলেন ইপিসিএস (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস) অফিসার। তার পিতা গান গাইতেন আর কলেরগানে গান শুনতে পছন্দ করতেন। বাবার শখের গ্রামোফোন রেকর্ডের গান শুনে কৈশোরে তিনি সঙ্গীত অনুরাগী হয়ে উঠেন। ছোটবেলা থেকে গাইতে গাইতে গান শিখেছেন। ১৯৫৮ সালে সৈয়দ আবদুল হাদী ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।
সৈয়দ আব্দুল হাদী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। সর্বশেষে তিনি লন্ডনে ওয়েল্স ইউনিভার্সিটিতে প্রিন্সিপাল লাইব্রেরীয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। সৈয়দ আবদুল হাদী দেশাত্ববোধক গানের জন্য জনপ্রিয়। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সঙ্গীত করছেন। ১৯৬০ সালে ছাত্রজীবন থেকেই চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে সৈয়দ আবদুল হাদী একক কণ্ঠে প্রথম বাংলা সিনেমায় গান করেন। সিনেমার নাম ছিল ‘ডাকবাবু’। মো. মনিরুজ্জামানের রচনায় সঙ্গীত পরিচালক আলী হোসেনের সুরে একটি গানের মাধ্যমে সৈয়দ আবদুল হাদীর চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। বেতারে গাওয়া তার প্রথম জনপ্রিয় গান ‘কিছু বলো, এই নির্জন প্রহরের কণাগুলো হৃদয়মাধুরী দিয়ে ভরে তোলো’। সালাউদ্দিন জাকি পরিচালিত ঘুড্ডি চলচ্চিত্রের গানে সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছিলেন লাকী আখ্ন্দ। এই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘সখি চলনা, সখি চলনা জলসা ঘরে এবার যাই’- গেয়েছেন সৈয়দ আবদুল হাদী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত হয় সৈয়দ আবদুল হাদীর প্রথম রবীন্দ্র সংগীতের একক অ্যালবাম ‘যখন ভাঙলো মিলন মেলা’। সৈয়দ আবদুল হাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে অনার্স পড়ার সময় সুবল দাস, পি.সি গোমেজ, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ প্রমুখ তাকে গান শেখার ক্ষেত্রে সহায়তা ও উৎসাহ যুগিয়েছেন। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (গোলাপী এখন ট্রেনে – ১৯৭৮, সুন্দরী – ১৯৭৯, কসাই – ১৯৮০, গরীবের বউ – ১৯৯০, ক্ষমা- ১৯৯২) ঢাকা ৮৬ চলচ্চিত্রের ‘আউল-বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকসন এলোরে’ গানটির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হাত থেকে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন৷ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। দৈনিক প্রথম আলো কর্তৃক মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা ২০২২ এ ভূষিত হন।
গৌরাঙ্গ লাল আইচ প্রকাশ জুয়েল আইচের জন্ম ১০ এপ্রিল বরিশালে হলেও ছেলেবেলা কেটেছে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সমুদয়কাঠির গ্রামের বাড়িতে। বাবা বি. কে. আইচ ও মা সরযু আইচের পুত্র সেই সুবাদে সমুদয়কাঠি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ সম্পন্ন হয়। পরে তিনি পিরোজপুর শহরে চলে আসেন। সেখানকার পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং স্থানীয় পিরোজপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এছাড়াও শিক্ষকতার সুবাদে তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে বিএড কোর্স সমাপ্ত করেন। তিনি ১৯৮৫ সালের ১৩ জুুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দরবেশ আলী খানের কন্যা পাশা খসনুকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের পরে পাশা খসনু নাম পরিবর্তন করে বিপাশা আইচ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাদের একমাত্র কন্যার নাম খেয়া আইচ। খুব ছোটবেলা বাড়িতে বেদেবহর এসেছিল, তাদের কাছেই প্রথম যাদু দেখে ভালো লেগে যায় জুয়েল আইচের। সেই ভালোলাগা ভালোবাসায় পরিণত হয় বানারীপাড়া সার্কাস দলের এক যাদুকরের গলা কাটার যাদু দেখে। পরে ওই যাদুটা এক বন্ধুর ওপর প্র্যাকটিস করে কিছুটা সফলও হন। যাদুর প্রতি তার ভালোবাসাটা উন্মাদনায় পরিণত হয় সিরাজগঞ্জের যাদুকর আবদুর রশিদের যাদু দেখে, আর বন্দে আলী মিয়ার রূপকথা পড়ে। একটু একটু করে যাদু শিখতে লাগলেন তখন থেকেই, বিভিন্নজনের কাছে। তার বিখ্যাত যাদু — কাগজ থেকে ডলার বানানো, চোখ বেঁধে গাড়ি চালানো, কাটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়া লাগানো ইত্যাদি। মঞ্চে প্রথম যাদু প্রদর্শন করেন ১৯৭২ সালে। এছাড়া মিডিয়ায় প্রথম যাদু প্রদর্শন করেন ১৯৭৯ সালে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। জগন্নাথ কলেজের ছাত্র সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের নেতৃত্বে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। তিনি একুশে পদক, কাজী মাহমুদুল্লাহ স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ টেলিভিশন পুরস্কার, যুক্তরাষ্ট্রের সেরা জাতীয় পুরস্কার ‘বেস্ট ম্যাজিশিয়ান অব দ্যা ইয়ার’, সোসাইটি অফ অ্যামেরিকান ম্যাজিশিয়ান ১৯৮১, সিজেএফবির আজীবন সম্মাননা ২০০৮, বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ ২০২০ সহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন।
