ডা. নওরোজ আহমেদ রায়হান: কাশি আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। শ্বাসনালিতে ধুলো, জীবাণু, ভাইরাস, ধোঁয়া বা অ্যালার্জিজনিত কোনো কণা প্রবেশ করলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই কাশির মাধ্যমে সেগুলো বের করে দিতে চেষ্টা করে। তাই সব কাশি রোগের লক্ষণ নয়; অনেক সময় এটি শরীরের সুরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। সাধারণত ঋতু পরিবর্তন, ঠান্ডা লাগা বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণে যে সর্দি-কাশি হয়, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। অধিকাংশ সাধারণ সর্দি-কাশির কারণ ভাইরাস সংক্রমণ এবং সাধারণত ৫-৭ দিনের মধ্যে উপসর্গ কমে আসে।
সাধারণ ঠান্ডাজনিত কাশির সঙ্গে কিছু পরিচিত উপসর্গ দেখা যায়। এর মধ্যে হালকা জ্বর, গলা ব্যথা বা খুসখুসে ভাব, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ থাকা, শরীর কিছুটা দুর্বল লাগা কিংবা হালকা মাথাব্যথা থাকতে পারে। কখনও কখনও শুকনো কাশি হয়, আবার কখনও সামান্য কফও বের হতে পারে। এসব উপসর্গ সাধারণত গুরুতর নয় এবং সঠিক বিশ্রাম ও যত্ন নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজে থেকেই সেরে যায়।
এ ধরনের সাধারণ সর্দি-কাশিতে কিছু সহজ করণীয় মেনে চললে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। প্রথমত পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্রাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার পান করা দরকার। যেমন- গরম পানি, স্যুপ বা ভেষজ চা। এতে গলা আর্দ্র থাকে এবং কফ পাতলা হতে সাহায্য করে। গরম পানির ভাঁপ নেওয়া নাক বন্ধ ও গলার অস্বস্তি কমাতে উপকারী হতে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ কাশির সিরাপ, গলার লজেন্স বা জ্বর ও ব্যথা কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি, সব কাশি সাধারণ নয়। কখনও কখনও কাশি শরীরের ভেতরে গুরুতর কোনো রোগের ইঙ্গিতও দিতে পারে।
যদি কাশি দুসপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, কফের সঙ্গে রক্ত বের হয়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকব্যথা অনুভূত হয়, বা অকারণে ওজন কমে যেতে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। এসব লক্ষণ ফুসফুসের বিভিন্ন জটিল রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। আবার যক্ষ্মা রোগেও দীর্ঘদিন কাশি, কফের সঙ্গে রক্ত, দুর্বলতা ও ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধূমপান করেন এমন- ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। দীর্ঘমেয়াদি ধূমপানের ফলে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি হতে পারে, যার প্রধান লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কফ ও শ্বাসকষ্ট। একইভাবে ফুসফুসের ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়েও অনেক সময় দীর্ঘদিনের একটানা কাশি ছাড়া অন্য কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই দীর্ঘস্থায়ী কাশি কখনই অবহেলা করা উচিত নয়।
এছাড়া অ্যালার্জি, অ্যাজমা, গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স বা পাকস্থলীর অ্যাসিড ওপরে উঠে আসা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হৃদরোগের কারণেও দীর্ঘদিন কাশি হতে পারে। তাই কাশির ধরন শুকনো না কফযুক্ত, কতদিন ধরে হচ্ছে, দিনের কোন সময় বেশি হচ্ছে এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না- এসব বিষয় বিবেচনা করে সঠিক মূল্যায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক
বক্ষব্যাধি মেডিসিন, এলার্জি ও সিøপ এপনিয়া বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার, কচুক্ষেত শাখা, মিরপুর–১৪, ঢাকা