রাজধানীসহ জেলা শহর ছাড়িয়ে হাম ছড়িয়ে পড়ছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। আক্রান্তের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। গতকাল পর্যন্ত দেশের পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রাঙামাটি ছাড়া ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গতকাল সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে আরও ১ হাজার ৪২১ শিশু শরীরে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গে ঢাকা বিভাগে ৫ শিশু, সিলেট বিভাগে ১ শিশু এবং রাজশাহী বিভাগে ১ শিশু মারা গেছে। এ সময়ে নিশ্চিত হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে এক শিশু এবং হামের উপসর্গে মারা গেছে ৭ শিশু। একই সময়ে দেশে আরও ১ হাজার ৪২১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গে দেশে মোট ২১৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৪৩টি শিশু। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ৩২ হাজার ২৮ শিশুর। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১ হাজার ৪৩৪ শিশু। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১৭ হাজার ৯৫৫ শিশু বাড়ি ফিরেছে।
জানা গেছে, বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে গত দুই সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উপজেলা শহর থেকে দুর্গম কুরুকপাতায় পৌঁছাতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। ইউনিয়নের ইয়াংরিংপাড়ায় ‘প্রেন্নই হোস্টেল’ নামে একটি বেসরকারি অনাথ আশ্রমে থাকা তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী চাংমুম ম্রো গত মঙ্গলবার হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুরুর দিকে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ বিভাগীয়
শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে গ্রামের শিশুরাও আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি শঙ্কাজনক হারে মারা যাচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের অগ্রগতি ও ঘাটতি পর্যালোচনা সমন্বয় সভায় গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রাঙামাটি ছাড়া দেশের অন্য ৬১ জেলায় হাম সংক্রমিত হয়েছে। দেড় মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তির মধ্যেও এ রোগ শনাক্ত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে হামজনিত মৃত্যুর হার ১ থেকে ৩ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে তা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রতিনিধিরা বলেন, সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণে টিকাদানের হার আশানুরূপ বেড়েছে। গত শনিবার পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে পাঁচ বছরের নিচে ৫ থেকে ৬ শতাংশ শিশু এখনও টিকার বাইরে রয়েছে, বিশেষ করে প্রান্তিক ও কর্মজীবী অভিভাবকদের সন্তানদের মধ্যে এ হার বেশি।
সভাপতির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, যেসব শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে ভ্রাম্যমাণ টিমের মাধ্যমে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেট প্রতিনিধি : সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে আরও দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ৯টার দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে গত শুক্রবার এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে সিলেটে গত ১৮ দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৯টার দিকে হাসপাতালের পিআইসিইউতে সিলেটের গোলাপগঞ্জের তাহা নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া শিশুটির নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হামের উপসর্গ ছিল। এর আগে ২৪ এপ্রিল শিশুটিকে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রায় একই সময়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের দেড় বছর বয়সী ওয়াজিহা নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া শিশুটির নিউমোনিয়া, হার্ট ফেইলিউর ও হামের উপসর্গ ছিল।
ময়মনসিংহ প্রতিবেদক : ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন সাড়ে তিন মাস বয়সী এক শিশুর গতকাল মৃত্যু হয়েছে। গতকাল নতুন করে আরও ২৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮৪টি শিশু। হাসপাতালটিতে গত ১৭ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৫৬টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৭৫৫ শিশু। মৃত্যু হয়েছে ১৭ শিশুর।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, মারা যাওয়া শিশুর নাম আরিশা। সে জেলার ত্রিশাল উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের আরাফাত হোসেন ও রুমা আক্তার দম্পতির সন্তান। ২১ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
