চোখের আঘাতে কয়েক ধাপে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। চোখ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নরম একটি অঙ্গ। বাইরের আঘাত থেকে সুরক্ষার জন্য এটি শক্ত হাড়নির্মিত চক্ষুকোটরের ভেতরে অবস্থান করলেও দেখার প্রয়োজনে সামনের দিকটি খোলা থাকে। এই খোলা অংশের কারণেই চোখ সহজে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যদিও চোখের পাতা সার্বক্ষণিকভাবে এটিকে রক্ষার চেষ্টা করে।
নানাভাবে চোখে আঘাত লাগতে পারে। খেলাধুলার সময় ব্যাডমিন্টনের কর্কের আঘাত, ওয়েল্ডিং বা গ্রিন্ডিং মেশিনে কাজ করার সময় পাথর বা লোহার কণা ছিটকে আসা, পড়াশোনার সামগ্রী যেমন পেনসিল, স্কেল বা কম্পাসের আঘাত এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনার ফলে চোখে আঘাত লাগা খুবই সাধারণ ঘটনা। সম্প্রতি ছররা গুলিতেও অনেকের চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে। এ ছাড়াও স্পিল্টারজনিত চোখের আঘাতও কম নয়।
ধরন অনুযায়ী চোখের আঘাতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায় ব্লান্ট ট্রমা, অর্থাৎ ভোঁতা কোনো বস্তুর আঘাত এবং পেনিট্রেটিং ইনজুরি, অর্থাৎ ধারালো বস্তু দ্বারা চোখের আবরণ ভেদ করে হওয়া আঘাত। পেনিট্রেটিং ইনজুরিতে চোখের ভেতরের বস্তু সহজেই বাইরে চলে আসতে পারে, আবার চোখের বাইরে থেকে কোনো বস্তু বা জীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এ ধরনের আঘাতে চোখের ভেতর রক্তক্ষরণ হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। চোখের ভেতরে কোনো বস্তু ঢুকে গেলে, যাকে ইন্ট্রা-অকুলার ফরেন বডি বলা হয়, তখন রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণ উভয়ই চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার বা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। আবার আঘাতের ফলে চোখের অভ্যন্তরের গঠনগত অংশ বাইরে চলে এলেও স্থায়ী অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। চোখে আঘাতের প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য আঘাতটি পেনিট্রেটিং কি-না, চোখের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে কি-না, কোনো বিদেশি বস্তু ভেতরে রয়ে গেছে কি-না, চোখের ভেতরের অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে কি-না কিংবা সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে কি না, এসব মূল্যায়নে আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান অথবা এক্স-রের প্রয়োজন হতে পারে।
যে-কোনো চোখের আঘাতের ক্ষেত্রে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দ্রুত সময়ের মধ্যে ইনজুরি রিপেয়ার করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। চোখের ভেতরে কোনো বস্তু থেকে গেলে তা যত দ্রুত সম্ভব অপসারণ করা জরুরি। চোখে আঘাত পাওয়ার পর নিজে থেকে পানি বা অন্য কোনো তরল দিয়ে চোখ ধোয়ার চেষ্টা করা কিংবা পরিষ্কার করার চেষ্টা করা উচিত নয়। নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে একটি স্টেরাইল গজ সংগ্রহ করে চোখ ঢেকে দ্রুত চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনে মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে। তবে চোখে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দেওয়া যাবে না, বিশেষ করে যদি চোখের আবরণ ভেদ করা আঘাতের আশঙ্কা থাকে। চোখের আঘাতে চিকিৎসা প্রায়ই একাধিক ধাপে সম্পন্ন করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সার্জন বা একাধিক সেন্টারে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন
ভাইস প্রিন্সিপাল, মার্কস মেডিক্যাল কলেজ, মিরপুর-১৪, ঢাকা
কনসালট্যান্ট, আইডিয়াল আই কেয়ার সেন্টার, আদাবর, ঢাকা
