শীত এলেই শরীরে যেন এক ধরনের আলসেমি ভর করে। কাজে মন বসে না, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, শরীরে স্ফূর্তি কমে যায়। ধীরে ধীরে চেহারায় ফ্যাকাসে ভাব দেখা দেয়, খাওয়াদাওয়ার আগ্রহও কমতে থাকে। বেশির ভাগ সময়ই এসব লক্ষণকে শীতকালীন আলসেমি ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই উপসর্গগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে রক্তাল্পতার মতো গুরুতর সমস্যা।
শীতকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। উষ্ণ কম্বলের আরাম ছেড়ে ঠান্ডায় উঠে স্নান-খাওয়া সেরে কাজে বের হওয়া অনেকের কাছেই কঠিন লাগে। ফলে দেরিতে অফিস পৌঁছানো কিংবা কাজে অনীহা তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। তবে সমস্যা হলো অফিসে পৌঁছানোর পরও যদি সারাক্ষণ ঝিমুনি, দুর্বলতা আর মনমরা ভাব কাজ করে, তাহলে বিষয়টি আর আলসেমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা শরীরে রক্তস্বল্পতার ইঙ্গিতও হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যানিমিয়া।
রক্তাল্পতার সাধারণ লক্ষণ
রক্তাল্পতার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা। এ ছাড়া শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, ত্বক ফ্যাকাসে দেখানো এসবই এর উপসর্গ। অনেক ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। আয়রনের ঘাটতির কারণে রক্তাল্পতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চুল পড়ার সমস্যাও দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে অবসাদ বেড়ে যায় এবং হৃদ্স্পন্দনের গতি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়ে যেতে পারে।
কেন হয় রক্তাল্পতা?
মূলত রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা কমে গেলে বা সেগুলো দ্রুত নষ্ট হলে রক্তাল্পতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ঋতুস্রাব, অর্শের মতো সমস্যায় ভুগলেও এই রোগ হতে পারে। পাশাপাশি ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, লিভার বা কিডনির জটিলতাও রক্তাল্পতার ঝুঁকি বাড়ায়। ভিটামিন বি-১২-এর অভাব থেকেও অনেক সময় এই রোগ দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে কৃমি সংক্রমণ রক্তাল্পতার বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করবেন
রক্তাল্পতা শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো রক্ত পরীক্ষা। সাধারণত সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে হিমোগ্লোবিন ও লোহিত কণিকার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হয়।
ঘরোয়া যত্ন ও খাদ্যাভ্যাস
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের অসতর্কতাই শরীরে আয়রনের ঘাটতির মূল কারণ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রতিদিন প্রায় ৮ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন হলেও নারীদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা প্রায় ১৮ মিলিগ্রাম। গর্ভবতী নারীদের জন্য দৈনিক আয়রনের প্রয়োজন আরও বেশি প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম।
চিকিৎসকদের মতে, রক্তাল্পতা এখন অনেকটাই জীবনযাপনজনিত রোগে পরিণত হয়েছে। তবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কিছু আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখলে এই সমস্যা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। মসুর ডাল, পালংশাক, আলু, কাজুবাদাম এসব খাবার আয়রনের ভালো উৎস। পাশাপাশি কিশমিশ, টমেটো, মটরশুঁটি ও শিমের বীজ নিয়মিত খেলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।
শীতের ক্লান্তিকে হালকাভাবে না নিয়ে শরীরের সংকেতগুলোর দিকে নজর দেওয়াই হতে পারে সুস্থ থাকার প্রথম ধাপ।
