ডা. এ বি এম শাকিল গণি: বাংলাদেশে লিভার ক্যানসারের প্রায় ৬৬ শতাংশের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ এই ভাইরাস বহন করছেন, যা মোট জনসংখ্যার ৫.৪ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি তিনজনে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন।
উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের বড় অংশই জানেন না যে, তারা ভাইরাসটি বহন করছেন। ফলে অজান্তেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। হেপাটাইটিস-সি তুলনামূলকভাবে কম হলেও দেশে প্রায় ০.৮৪ শতাংশ বা ১৫ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত এবং এটি মোট লিভার ক্যানসারের প্রায় ৫ শতাংশের জন্য দায়ী। তবে আশার কথা হলো, লিভার রোগের অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। বর্তমানে এসব রোগের আধুনিক চিকিৎসা বাংলাদেশেই সম্ভব। লিভারের প্রদাহকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হেপাটাইটিস বলা হয়।
হেপাটাইটিস-বি ও সি ভাইরাস লিভারের কোষে বংশবিস্তার করে ধীরে ধীরে। দীর্ঘদিন সংক্রমণ চলতে থাকলে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ক্যানসার হতে পারে। এ ভাইরাসগুলো মূলত রক্ত ও দেহের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন দূষিত সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে শিশুর দেহে সংক্রমণ, অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতস্থানের সংস্পর্শ, জীবাণুমুক্ত যন্ত্র ছাড়া দাঁতের চিকিৎসা, ট্যাটু বা বডি পিয়ার্সিং এবং ডায়াবেটিস পরীক্ষার সুচ শেয়ার করা। তবে একসঙ্গে খাওয়া, বসবাস বা স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায় না এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুচ বা ধারালো বস্তুতে আঘাতের পর হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণের ঝুঁকি ২৩ থেকে ৬২ শতাংশ, আর হেপাটাইটিস-সি’র ক্ষেত্রে তা প্রায় ১.৮ শতাংশ। হেপাটাইটিস-বি’র চিকিৎসা নেই এ ধারণা ভুল। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো এর চিকিৎসা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি হলেও সঠিক চিকিৎসা লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারের মতো ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ যত্রতত্র ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হয়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত ব্যক্তির নিয়মিত লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও ফলোআপ জরুরি। ২০ বছরের বেশি বয়সী সবার হেপাটাইটিস-বি টিকা নেওয়া উচিত। মাত্র তিন ডোজে প্রায় ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া যায়। নিরাপদ পানি পান করা, অনুমোদিত ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে দাঁতের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করানো এবং জীবনে কখনও রক্ত নেওয়া বা বড় কোনো অপারেশন হয়ে থাকলে অন্তত একবার হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
হেপাটাইটিস-সি বর্তমানে মাত্র তিন মাসের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য এবং এর ওষুধ বাংলাদেশে সহজলভ্য। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। রোগটির সংক্রমণের পথ, প্রতিরোধ ও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে অযথা ভয় বা সামাজিক গোপনীয়তা এড়ানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সাধারণভাবে রোগীর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, মেলামেশা বা চলাফেরায় হেপাটাইটিস ছড়ায় না।
লেখক : মেডিসিন, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার বিশেষজ্ঞ
এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, হেপাটোলজি বিভাগ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, শ্যামলী-২, ঢাকা
The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/q5nj
