একইভাবে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সৌরভ শিকদারও দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, চুল পড়া ও ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছিলেন। শুরুতে তিনি বিষয়টিকে কর্মব্যস্ততার চাপ বলে মনে করেছিলেন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে হাইপোথাইরয়েড। এখন নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করলেও তার আফসোস- আগেই রোগটি শনাক্ত হলে এত কষ্ট পোহাতে হতো না।
চিকিৎসকদের মতে, নুসরাত ও সৌরভের মতো দেশে হাজারো মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় ভুগলেও অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারেন না। কারণ এর উপসর্গগুলো সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হয়, ফলে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়।
থাইরয়েড বিষয়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসের (নিনমাস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড গলার সামনের দিকে থাকা প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা এবং মানসিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই গ্রন্থি থেকে হরমোন কম বা বেশি নিঃসৃত হলে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েড প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে- হাইপোথাইরয়েড ও হাইপারথাইরয়েড। হাইপোথাইরয়েড হলে হরমোনের ঘাটতি দেখা দেয়, যার ফলে ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা, বিষণ্নতা ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েড হলে হরমোন অতিরিক্ত তৈরি হয়, ফলে ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, হাত কাঁপা, অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
থাইরয়েড ঝুঁকি কেন বাড়ছে- এ বিষয়ে অধ্যাপক ফজলুল বারী জানান, নারীদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে গর্ভধারণের পর, হরমোন পরিবর্তনের সময় এবং বয়ঃসন্ধিকালে ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে অবহেলা করলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তরুণদের মধ্যে অনিয়মিত জীবনযাপন, ঘুমের ঘাটতি, ফাস্টফুড গ্রহণ এবং মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তার মতে, বর্তমানে প্রতি পাঁচজন রোগীর মধ্যে তিনজনই নারী, যারা কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত, তবে অধিকাংশই দেরিতে শনাক্ত হন।
বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ফরিদুল আলম বলেন, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, হঠাৎ ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়া, চুল পড়া, অতিরিক্ত ঘাম বা ঠান্ডা অনুভব, মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ, মাসিক অনিয়ম, ঘুমের সমস্যা কিংবা গলায় ফোলা- এ ধরনের উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। তিনি আরও বলেন, থাইরয়েডের চিকিৎসা না নিলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস এবং গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাত জাগা, মোবাইলনির্ভর জীবন, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়েট শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ থাইরয়েড রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির মহাসচিব ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, শরীরের ছোট পরিবর্তনও অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ নীরবে শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে যাওয়া এই রোগ সময়মতো শনাক্ত হলে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।
বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশুরাও ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি ২,৩০০ নবজাতকের মধ্যে একজন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
