আকার অনুযায়ী গলগণ্ডকে তিনটি স্তরে বর্ণনা করা হয়। প্রথম স্তরে গলগণ্ড চোখে দেখা যায় না, তবে স্পর্শ করলে বোঝা যায়। দ্বিতীয় স্তরে এটি স্পষ্টভাবে দেখা ও অনুভব করা যায়। তৃতীয় স্তরে গলগণ্ড অত্যন্ত বড় আকার ধারণ করে এবং কখনও কখনও স্টার্নামের নিচে প্রবেশ করে খাদ্যনালীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা শ্বাসকষ্ট বা গিলতে অসুবিধার কারণ হতে পারে।
লক্ষণ ও উপসর্গের ক্ষেত্রে গলগণ্ড সাধারণত ঘাড়ের গোড়ায় একটি স্ফীতি হিসেবে প্রকাশ পায়। তবে এটি শুধু বাহ্যিক পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নয়; থাইরয়েড হরমোনের তারতম্যের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যদি হাইপারথাইরয়েডিজম (অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদন) যুক্ত থাকে, তাহলে রোগীর হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া (ট্যাকিকার্ডিয়া), বুক ধড়ফড়, অস্থিরতা, হাত কাঁপা, উচ্চ রক্তচাপ এবং গরম সহ্য করতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এ অবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যায়, অক্সিজেনের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং কখনও চোখ সামনের দিকে উঁচু হয়ে আসতে পারে (এক্সোফথালমোস)। অন্যদিকে, হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোনের স্বল্পতা) থাকলে রোগীর ক্ষুধামন্দা, ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অবসাদ, মানসিক ধীরগতি এবং ওজন বৃদ্ধি হতে পারে। এসব লক্ষণ অনেক সময় অস্পষ্ট হওয়ায় রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।
গলগণ্ডের প্রধান কারণ হিসেবে আয়োডিনের অভাবই সবচেয়ে বেশি দায়ী, বিশেষত যেসব অঞ্চলে আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার কম। এছাড়া সেলেনিয়ামের ঘাটতি, অটোইমিউন রোগ, যেমনÑ হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস এবং কিছু ক্ষেত্রে সায়ানাইডযুক্ত খাদ্য (যেমনÑ অপর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাত কাসাভা) গ্রহণের কারণেও এ রোগ হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ে প্রথমেই থাইরয়েড ফাংশন পরীক্ষা (ঞ৩, ঞ৪, ঞঝঐ) করা হয়, যা গ্রন্থির কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। এরপর ঘাড়ের আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গ্রন্থির আকার, গঠন এবং নোডিউলের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। সন্দেহজনক ক্ষেত্রে ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজি করা হয়, যা নোডিউলটি ক্যানসারজনিত কি না, তা নির্ধারণে সহায়ক।
চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে কারণনির্ভর। যদি থাইরয়েড হরমোন বেশি উৎপাদিত হয়, তাহলে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ব্যবহার করে গ্রন্থিকে সংকুচিত করা হয়। আয়োডিনের অভাবজনিত গলগণ্ডে আয়োডিন সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়। হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে থাইরয়েড হরমোন সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষত বড় আকারের গলগণ্ড বা ক্যানসার সন্দেহে আংশিক বা সম্পূর্ণ থাইরয়েডেক্টমি (অপারেশন) প্রয়োজন হতে পারে।
সচেতনতা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গলগণ্ড প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি সহজ কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
লেখক : কনসালট্যান্ট, জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি বিভাগ
চেম্বার : আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬, ঢাকা
