রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও ইবাদতের এক মহিমান্বিত সময়। এ সময় মানুষ শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকেন না, বরং নিজের জীবনযাপন, চিন্তা-ভাবনা ও আচরণেও সংযম আনার চেষ্টা করেন। তবে দীর্ঘ সময় রোজা রাখা, দৈনন্দিন সময়সূচির পরিবর্তন এবং খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা শরীরের বিভিন্ন রোগের ওপর কিছু প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা গ্লুকোমা বা চোখের চাপজনিত রোগে ভুগছেন, তাদের জন্য রমজান মাসে কিছু বাড়তি সচেতনতা ও পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্লুকোমা রোগীকে সেহরি ও ইফতারের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি, তবে একসঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান না করে ধীরে ধীরে পান করা ভালো। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে চোখের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ভারসাম্যও বিঘ্নিত হতে পারে। একইসঙ্গে অতিরিক্ত কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংক এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ এগুলো অনেক ক্ষেত্রে শরীরকে পানিশূন্য করে তুলতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চোখের চাপের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ইবাদতের সময় দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রাখা বা একটানা বসে থাকা হলে মাঝে মাঝে অল্প বিরতি নেওয়া ভালো। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত বা অন্য ইবাদতের সময় শরীরকে স্বাভাবিকভাবে বিশ্রাম দেওয়া চোখের জন্যও উপকারী। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনিয়মিত ঘুম শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে এবং কিছু ক্ষেত্রে চোখের চাপের পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্ক থাকতে পারে। এ ছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানোর জন্য শাকসবজি, ফলমূল এবং আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খাওয়া উচিত, কারণ অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগের অভ্যাসও কখনও কখনও চোখের চাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গ্লুকোমা চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নিয়মিত চোখের ড্রপ ব্যবহার করা। রমজান মাসেও এ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় রোগীরা রোজার কারণে ওষুধ ব্যবহারের সময় নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান বা নিজে নিজে সময় পরিবর্তন করে ফেলেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সাধারণভাবে যেসব রোগী দিনে একবার ড্রপ ব্যবহার করেন, তারা ইফতারের পর তা ব্যবহার করতে পারেন। যারা দিনে দুবার ড্রপ ব্যবহার করেন, তারা ইফতারের পর এবং সেহরির আগে ব্যবহার করতে পারেন। আর দিনে তিনবার বা তার বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত। কখনই নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ করা বা সময় পরিবর্তন করবেন না। কারণ এতে চোখের চাপ হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই চক্ষু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ ব্যবহারের সময়সূচি ঠিক করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
অনেক রোগী মনে করেন, চোখে ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যেতে পারে। বাস্তবে ইসলামী চিন্তাবিদ ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখের ড্রপ ব্যবহারে রোজা ভঙ্গ হয় না। তাই চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে দ্বিধা করার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া মানসিক চাপ বা উদ্বেগ অনেক সময় শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে, যা চোখের চাপের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা, নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এবং এটিকে নিজের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদেরও রোগ সম্পর্কে জানানো উচিত, যাতে তারা প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে পারেন।
লেখক : অধ্যাপক এবং গ্লুকোমা রোগ বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশ আই হসপিটাল, মালিবাগ মোড়, ঢাকা
