নিউমোনিয়া বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ার মধ্যে স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়ে সবচেয়ে সাধারণ। এছাড়া হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ও স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস গুরুত্বপূর্ণ। ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া হতে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, আরএসভি (রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস) এবং সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের মাধ্যমে। ফাঙ্গাল বা ছত্রাকজনিত নিউমোনিয়া তুলনামূলকভাবে কম হলেও এইচআইভি আক্রান্ত বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম- এমন ব্যক্তির মধ্যে নিউমোসিস্টিস জিরোভেসি দ্বারা সংক্রমণ দেখা যেতে পারে।
এ রোগ সাধারণত হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো জীবাণুবাহী ড্রপলেটের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শেও রোগ ছড়াতে পারে। কখনও কখনও মুখ ও নাকের স্বাভাবিক জীবাণু শ্বাসনালির মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করেও নিউমোনিয়া সৃষ্টি করতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, পঁয়ষট্টি বছরের বেশি বয়স্ক মানুষ, ডায়াবেটিস, সিওপিডি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, ধূমপায়ী এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা এ রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
নিউমোনিয়ার প্রধান লক্ষণের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাঁপুনি, কাশি (কফসহ অথবা কফ ছাড়া), বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং দ্রুত শ্বাস নেওয়া। শিশুর ক্ষেত্রে বুক দেবে যাওয়া, খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক নিস্তেজতা দেখা যেতে পারে। রোগ গুরুতর হলে ঠোঁট ও নখ নীল হয়ে যায়, অচেতনতা এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়।
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণের ওপর। ব্যাকটেরিয়াজনিত হলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ায় প্রধানত সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ছত্রাকজনিত নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ প্রয়োজন। সহায়ক চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে অক্সিজেন থেরাপি, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল এবং গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে নিবিড় পর্যবেক্ষণ। চিকিৎসা নিতে দেরি হলে নিউমোনিয়ার বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- তীব্র শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসে পুঁজ জমা হওয়া (এমপাইমা), সেপসিস এবং শ্বাসযন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যর্থ হওয়া। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এছাড়া ধূমপান পরিহার, ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিউমোনিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকাদান কার্যক্রম নিউমোনিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিউমোনিয়া গুরুতর হলেও প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধ গড়তে পারলে এ রোগে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আলোক হাসপাতাল লিমিটেড
