ডা.মারুফা রহমান: সাম্প্রতিক সময়ে হাম নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছেন অভিভাবকরা। হাম নিয়ে সন্তানের বাবা-মায়ের এতটাই আতঙ্কিত যে, অনেকে মশার কামড়ের দাগ দেখলেও হাম ভেবে ডাক্তারের কাছে ছুটছেন।
সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চান—টিকা দেওয়া সত্ত্বেও হাম কেন হয়? আবার যেসব বাচ্চা এখনও টিকার আওতায় আসেনি, তারাই বা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে? আক্রান্ত হলে করণীয় কী?
আজ আমরা কথা বলবো হাম বা Measles নিয়ে। হাম দেখতে নিরীহ মনে হলেও এটি অত্যন্ত সংক্রামক। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে এক সঙ্গে ১৬–১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্র্যান্স, ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক দেশে হামের প্রকোপ দেখা গেছে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে—
👉টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়া
👉কোভিড সময় টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া
👉শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বৃদ্ধি
👉টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা
আমাদের দেশের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় পঞ্চাশ শতাংশের বেশি আক্রান্ত শিশু এখনও টিকার আওতায় আসেনি। এই সংখ্যাটা এত বেশি কেন?
আমরা জানি, হামের টিকা ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। এর আগে পর্যন্ত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। কিন্তু ৯ মাসের কম বয়সি শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ পাওয়া গেছে—
১. অনেক মা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং করান না
২. অনেক মা নিজেও ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত নন
আমরা সবসময় বলি—প্রথম ৬ মাস শুধু মায়ের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে ফর্মুলা ফিড বা গরুর দুধ দেওয়া হয়, যা সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষা থেকে তাকে বঞ্চিত করে।
এবার আসি বাকি শিশুদের কথায়—যাদের মধ্যে কেউ আংশিক টিকা নিয়েছে, কেউ নেয়নি, আবার কেউ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—
👉 ভ্যাকসিন নিলে কখনই ১০০% নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না যে রোগ হবে না
👉 কিন্তু ভ্যাকসিন নিশ্চিতভাবে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা অনেক কমিয়ে দেয়
তাই “ভ্যাকসিন নিয়েছি, তারপরও কেন হলো?”—এই প্রশ্নের উত্তর হলো, ভ্যাকসিন আপনাকে সম্পূর্ণ রক্ষা না করলেও মারাত্মক জটিলতা থেকে বাঁচায়।
এছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে হামের জটিলতা বেশি দেখা যায়।অপুষ্টি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দূর্বল করে দেয়।বিশেষ করে যেসব শিশুর ওজন কম,পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায় না বা ভিটামিনের ঘাটতি আছে তাদের ক্ষেত্রে হাম হলে তা দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে।যেমন-
নিউমোনিয়া
তীব্র ডায়রিয়া
চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া ও অন্ধত্ব।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো হাম নিজেও অপুষ্টি বাড়িয়ে দেয়।আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর খাওয়ার রুচি কমে যায়,শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।তাহলে আমরা বলতে পারি এভাবে-
👉অপুষ্টি থাকলে হাম গুরুতর হয়
👉আবার হাম হলে অপুষ্টি আরও বাড়ে
এই কারনে হামে আক্রান্ত প্রতিটি শিশুকে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া অত্যন্ত জরুরী, কারন এটি জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।
তাই শুধু টিকা নয়, শিশুর সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে -যেমন মায়ের দুধ,ডিম,ডাল, শাকসবজি অর্থাৎ সুষম খাবার গ্রহন, পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান।
আক্রান্ত হলে করণীয়:
👉শিশুকে আলাদা রাখুন (isolation)
👉পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিন
👉ভিটামিন A সাপ্লিমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
👉জ্বর বা অন্য জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শেষ কথা:
হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়, তবে প্রতিরোধযোগ্য।
✔ সময়মতো টিকা
✔ মায়ের দুধ
✔ পুষ্টিকর খাবার
এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা আমাদের শিশুকে অনেক বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারি।
ডা.মারুফা রহমান
মেডিকেল অফিসার
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল,চাঁপাইনবাবগঞ্জ.
