ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন: ইরানের মূল শক্তি আসলে কোন জায়গায়?

- Advertisements -

দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ আটকে থাকার মতো পরিস্থিতি মিলিয়ে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই পরিস্থিতিতে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরানের শক্তি এখন আর শুধু সামরিক সক্ষমতা বা পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারই তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার সক্ষমতার মাধ্যমে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তির সমতুল্য বা তার থেকেও বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর বিরতির ঘোষণা আসে। ঠিক তার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর সতর্কবার্তা দেন, যেখানে তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও বড় ধরনের সংঘাত না ঘটায় এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে থেমে যায়।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে ইরান সামরিকভাবে সরাসরি বড় ধরনের পাল্টা আঘাত না করে বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেটি হলো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানির প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল ব্যবহৃত হয়, তার বড় একটি অংশ—প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর তেল এই রুটের ওপর নির্ভরশীল।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সামরিক উত্তেজনার সময় এই পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যারেলপ্রতি দাম অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয় এবং বহু দেশকে তাদের কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার করতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ ছাড়াও একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে প্রভাব বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে।

ইসরাইলের সাবেক এক উপদেষ্টার মন্তব্য অনুযায়ী, সংঘাত চলাকালে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি—যেমন সরকার পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানো। তার মতে, সামরিক দিক থেকে কিছু সাফল্য থাকলেও কৌশলগত দিক থেকে এটি কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি বিশ্লেষণ করেও দেখা যাচ্ছে যে, ইরান তুলনামূলকভাবে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উত্তেজনা কমাতে সম্মত হয়েছে, অন্যদিকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তার প্রভাব বজায় রেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী, এই রুটে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি বা টোল আদায়ের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ও তার মিত্ররা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে, যা তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।

হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো বাব আল-মান্দেব, যা ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে অবস্থিত এবং সুয়েজ খালের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই রুট দিয়ে পরিচালিত হয়। এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই তাদের রুট পরিবর্তন বা সাময়িকভাবে চলাচল স্থগিত করেছে। ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথি গোষ্ঠীর কার্যক্রমের কারণে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল আগেও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে একই সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। এই কারণে অনেক পর্যবেক্ষক ইরানের বর্তমান কৌশলকে ‘ভূগোলনির্ভর শক্তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

বর্তমানে হরমুজ অঞ্চলে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে আছে এবং অসংখ্য নাবিক নিরাপদে চলাচলের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা যায়। এতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষণগুলো বলছে, ইরানের প্রভাব এখন শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার সক্ষমতাই তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোতে ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণই পারমাণবিক শক্তির সমান বা তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/bb3o
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন