ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার তীব্র সমালোচনা করেছে রাশিয়া ও চীন। মস্কো জানিয়েছে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে—এমন কোনো প্রমাণ তারা দেখেনি। আর বেইজিং অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মঙ্গলবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেয়ন সারকে ফোনে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা যখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছিল, এমনকি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়েও অগ্রগতি হচ্ছিল, তখন এই হামলা সেই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘দুঃখজনকভাবে সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক হামলার বিরোধিতা করে চীন।’
ওয়াং ই আরও বলেন, সংঘাতের বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি এড়াতে অবিলম্বে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। ‘শক্তি প্রয়োগে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয় না; বরং নতুন সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর পরিণতি ডেকে আনে,’ তিনি মন্তব্য করেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানে চীনা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বানে সম্মতি দিয়েছেন গিদেয়ন সার। এর আগে সোমবার ওয়াং ই ইরান, ওমান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও আলাপ করেন, যাতে দ্রুত অবনতি হওয়া আঞ্চলিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা যায়।
অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনা করে বলেন, তাদের এই যুদ্ধ উল্টো সেই ফল বয়ে আনতে পারে, যা তারা ঠেকাতে চায়—অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার। এক সংবাদ সম্মেলনে লাভরভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপের যৌক্তিক পরিণতি হতে পারে—ইরানে এমন শক্তির উত্থান, যারা পারমাণবিক বোমা অর্জনের পক্ষে অবস্থান নেবে।
তার ভাষায়, ‘যাদের কাছে পারমাণবিক বোমা আছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর হামলা চালায় না।’ লাভরভ আরও সতর্ক করেন, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার পর আরব দেশগুলিও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামতে পারে, এতে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিস্তার সমস্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়, যদিও তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার বা অস্বীকার করে না।
লাভরভ বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ঘোষিত ‘মহৎ লক্ষ্য’ নিয়ে যুদ্ধ শুরু করা আসলে উল্টো প্রবণতাকেই উৎসাহিত করতে পারে। তিনি জানান, মঙ্গলবার তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এই সংকটের কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে রাশিয়া সহায়তা দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘উসকানিবিহীন সামরিক আগ্রাসন’ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দফা হামলা শুরু করলে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উসকানিবিহীন সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়েছে। তারা দাবি করে, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনার আড়ালে প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল শাসন পরিবর্তন।
মস্কোর সতর্কবার্তায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত অঞ্চলটিকে মানবিক, অর্থনৈতিক এবং সম্ভাব্য বিকিরণজনিত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই মানবসৃষ্ট সংকটের নেতিবাচক পরিণতি ও অনির্দেশ্য সহিংসতার দায় সম্পূর্ণ তাদের ওপরই বর্তাবে।
উল্লেখ্য, সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রয়েছে; ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর সেই যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে।
